সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ১০ দিনে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার দুই শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চার মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে ৮ এপ্রিল রাতে আরিশা নামের পাঁচ মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয় একই হাসপাতালে। আর ১০ এপ্রিল বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দিব্য নামের সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে জ্বর, সর্দি-কাশিতে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ১২৩টি শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫২টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিলেটের শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে ৬৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর ১০টি বেডের সবগুলোতেই রোগী ভর্তি রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রিপোর্টে ১৫ এপ্রিল সিলেট বিভাগে তিনজনের হাম শনাক্ত ও নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একইভাবে ১৪ এপ্রিল নতুন ভর্তি ৩৪ জন, ১৩ এপ্রিল ৩৫, ১২ এপ্রিল একজন শনাক্ত ও নতুন ভর্তি ৩৬, ১১ এপ্রিল একজন শনাক্ত ও নতুন ভর্তি ১৯, ১০ এপ্রিল একজন শনাক্ত ও নতুন ভর্তি ৪২, ৯ এপ্রিল একজন শনাক্ত ও নতুন ভর্তি ৩৬, ৮ এপ্রিল নতুন ভর্তি ৩৩, ৭ এপ্রিল ২৬, ৬ এপ্রিল ছয়জন শনাক্ত ও নতুন ভর্তি হয় ৪৪ জন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। শিশুদের জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে, যারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) বাইরে রয়ে গেছে, তারাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হাম রোগের টিকা দেওয়া হবে। প্রতিটি এলাকারই নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে এই টিকা দেওয়া হবে।
শিশুকে সময়মতো হাম ও রুবেলার (MR) টিকা দিতে এবং কোনো শিশু আক্রান্ত হলে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে নির্দেশ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
সিলেট শামসুদ্দীন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের চিকিৎসায় আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। অনেক শিশু নিউমোনিয়া বা হার্ট ফেইলিউরের মতো জটিলতা নিয়ে আসায় ঝুঁকি বাড়ছে।
‘গতকাল দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে ৬৪ জন ভর্তি আছে। আর ৯ জন আজ বৃহস্পতিবার হাসপাতাল ছেড়েছে। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এখন ওসমানী হাসপাতালেও আর রোগী পাঠানো যাবে না। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, হার্টে সমস্যা, কিডনি সমস্যাসহ নানা সমস্যা নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হয়। দিন দিন সিলেটের অবস্থা খারাপ হচ্ছে, রোগী ভর্তির সংখ্যাও বাড়ছে।’
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘সারা দেশের মতো সিলেটেও হামের সংক্রমণ বাড়ছে। প্রতিনিয়ত হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ওসমানীতে আমাদের ১০টি আইসিইউ বেড আছে। শামসুদ্দীন হাসপাতালে ১০০ শয্যা আছে। সেখানে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী থাকে। যদি অবস্থা আরও খারাপ হয়, ওসমানী মেডিকেলে আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করতে হবে। কোভিডের মতোই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং এ রকম প্রস্তুতি আমাদের আছে।’
স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেটের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, ‘নতুন করে কিছু মেডিকেল কর্মকর্তা দেওয়া হচ্ছে শামসুদ্দীন হাসপাতালে। ওসমানীতে আইসোলেশন আছে, তাদের বাড়ানোর জন্য বলেছি, সবকিছু প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমরা উপজেলা পর্যায়েও বলে রেখেছি, তাদের ওইখানে আইসোলেশন রেডি রাখার জন্য, যাতে তাদের ওইখানকার রোগী তারা চিকিৎসা দিতে পারে।
‘সদর হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন প্রস্তুত আছে, সেখানে রোগী ভর্তিও আছে। অনেক রোগী ভর্তি শেষে ভালো আছে। আর হামের স্যাম্পল সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়ে রিপোর্ট আসতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ দিন। এ কারণে সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় না, তবে চিকিৎসকেরা লক্ষণ দেখে অনেকটা বুঝতে পারেন।’