সিলেট সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর নাছিমা হক খানের বিরুদ্ধে আনীত গুরুতর অভিযোগ তদন্তে চরম দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও আলোর মুখ দেখেনি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন। প্রভাবশালী মহলের চাপে এই তদন্ত ফাইল চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
জানা যায়, গত বছরের ১০ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, সিলেট সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাছিমা হকের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের পেশাগত হয়রানি, তাৎক্ষণিক বদলির আদেশ অমান্য করে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান না করা, অনুপস্থিত থেকে বেতন-ভাতাদি ভোগ ও তথ্য গোপন করে পদোন্নতি লাভ করার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
উল্লিখিত বিষয়ে সরেজমিন তদন্তের দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। যার কারণে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও অধ্যাপক নাছিমা হক এবার বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ হতে জোর লবিং করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সহযোগী অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদটিতে পদায়ন আটকে রেখে নিজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতিতে যেসব সহকর্মী সহযোগিতা করেননি, তাঁদের পেশাগত হয়রানি করেন। নুরুল ইসলাম নাহিদ মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়লে হয়রানির শিকার সহকর্মীরা অভিযোগ জানালে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা হক খানকে সাতকানিয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রামে তাৎক্ষণিক বদলি করেন।
বদলির আদেশ অমান্য করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন তিনি। টানা সাড়ে পাঁচ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় নিজের তথ্য গোপন করে নিয়েছেন পদোন্নতি। পদোন্নতির ১৬ দিন পর সিলেট সরকারি কলেজে যোগদান করতে এলে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজ কলেজে তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে যোগদানপত্র গ্রহণ না করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। এর কিছুদিন পর অধ্যক্ষ বদলি হয়ে সিলেটের এম সি কলেজে চলে যান এবং পরবর্তীকালে প্রফেসর এ জেড এম মাঈনুল হোসেন কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করার পর নাছিমা হক খান এসে যোগদান করেন।
এই হিসাবে একটানা ৯ মাস ১৬ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও ভোগ করেছেন বেতন-ভাতাদি। যার প্রমাণ পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা শিক্ষকদের হয়রানি করে আটকিয়েছেন পদোন্নতি। এগুলোরও ব্যবস্থা নেয়নি মাউশি।
তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করা চার শিক্ষককে ২০২০ সালে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে মাউশিতে—যা পরবর্তীকালে মাউশির তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবে সেই তদন্তে তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে নির্দেশনার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, তদন্ত ঝুলে থাকায় অভিযোগকারী সহকর্মীরা আরও বেশি উৎকণ্ঠায় আছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষামন্ত্রীর আত্মীয়ের পরিচয়ে এই দম্পতি সিলেটের শিক্ষাঙ্গনে দেখিয়েছেন ক্ষমতার দাপট। এখন আবার কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে এই তদন্ত চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক (কলেজ-১) প্রফেসর মো. নুরুল হক সিকদার বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা দুজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম এটার তদন্তের জন্য। বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে এটার খোঁজ নেওয়া হয়নি। এখন আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। তারা কেন তদন্ত করল না, সেটাও দেখছি।’
এ বিষয়ে কথা বলতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।