গভীর রাত। হঠাৎ পাহাড়ের নীরবতা ভাঙে গাছ ভাঙার শব্দে। আতঙ্কে ঘুম ভাঙে আশপাশের বাসিন্দাদের। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, একদল বন্য হাতি এগিয়ে আসছে। মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, চিৎকার করে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। কখনো হাতির পাল ফিরে যায় পাহাড়ে, কখনো ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় গারো পাহাড়ে ধান ও কাঁঠালের মৌসুম ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘটে এমন ঘটনা। একসময় গারো পাহাড় ছিল বন্য হাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র। বন-জঙ্গল কমে যাওয়া ও মানুষের বসতি বাড়ায় তা এখন সংকুচিত। ফলে খাবার ও পানির সন্ধানে প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে হাতির পাল। নষ্ট করে কৃষকের ফসল, ভাঙে ঘরবাড়ি। হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রাণ হারায় মানুষ; মানুষের প্রতিরোধে মরে হাতিও। এতে দিন দিন তীব্র হচ্ছে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত শেরপুর জেলায় মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বে অন্তত ৪৭টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ৬৭ জন মানুষ। এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে গত ১১ বছরে মারা গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গারো পাহাড়ে বন্য হাতির বিচরণ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পিক পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি দলছুট বন্য হাতি এ অঞ্চলে চলে আসে। পরে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার কারণে হাতিগুলো আর ফিরে যেতে পারেনি।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা প্রায়ই রাতে লোকালয়ে ঢুকে ধান, ভুট্টা, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে। কখনো বসতবাড়িতেও হানা দেয়।
নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবি বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে হাতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছি। প্রতিবছরই কষ্ট করে ফলানো ফসল হাতির দল নষ্ট করে। বাড়িঘরেও তাণ্ডব চালায়।’
হাতির হাত থেকে ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) সদস্যরা মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল বাজিয়ে ও হইচই করে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে অনেক সময় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ২০১৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সীমান্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক বেড়া বা বায়োলজিক্যাল ফেন্সিং নির্মাণ করা হয়। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর হাতির বিচরণক্ষেত্র এবং সম্ভাব্য চলাচলের পথে এসব বেড়া স্থাপন করা হয়েছিল।
এরপর ২০১৫ সালে ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচি ও কর্নঝুড়া এলাকায় ১০০ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান করা হয়। তাওয়াকুচি, ছোট গজনী, বড় গজনী, হালচাটি ও মায়াঘাসি এলাকায় প্রায় ১৩ কিলোমিটারজুড়ে লেবু ও বেতকাঁটার বাগানও করা হয়।
হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সীমান্ত এলাকায় নির্মাণ করা হয় ১৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। হাতি তাড়াতে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বিভিন্ন সময়ে চার্জার লাইট, টর্চলাইট ও জেনারেটরও বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান আসেনি। পাহাড়ে হাতির খাদ্যসংকট থাকায় তারা বারবার লোকালয়ে চলে আসছে।
মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত নিরসনে সম্প্রতি শেরপুরে একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। তাতে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আগাম সতর্ক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর আগাম শনাক্তকরণ যন্ত্র বা আরলি ডিটেকশন ডিভাইস স্থাপনের বিষয়টি জানানো হয়।
সেমিনারে শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী জানান, প্রথম ধাপে নালিতাবাড়ীর বন্য হাতি উপদ্রুত এলাকায় ১৫টি এআই প্রযুক্তিনির্ভর আরলি ডিটেকশন ডিভাইস স্থাপন করা হবে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুত স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে জানমালের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যাবে। হাতিকে লোকালয়ে আসা থেকে বিরত রাখতে শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে বনের ভেতরেই খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারে জানানো হয়, সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দ থেকে হাতির বিচরণক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। যেসব এলাকায় হাতির অবস্থান বেশি, সেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জলাধার খনন করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে গভীর সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হবে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে এসব পাম্প নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, ‘গারো পাহাড় শেরপুরের প্রায় ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এখানে শতাধিক হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতিগুলোকে যেমন বাঁচাতে হবে, তেমনি মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। এ জন্য মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করা হবে। ইতিমধ্যে আমরা অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। হাতির খাদ্যের জোগানও নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
নুরুল করিম জানান, হাতিকে কোনো অবস্থাতেই বিরক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে ইআরটি ও বন বিভাগের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, গারো পাহাড়ে মানুষের অবাধ বিচরণ ও বৃক্ষ নিধনের কারণে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে তাদের খাবারের উৎস। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদেই লোকালয়ে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে হাতি। গারো পাহাড়, বন্য প্রাণী ও নদী রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা বিপ্লব দে কেটু বলেন, ‘হাতি প্রকৃতির পাহারাদার। আমরা চাই হাতি ও মানুষের সহাবস্থান তৈরি হোক। এ জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।’
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খান বলেন, মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা নিতে হবে। বন উজাড় ও পাহাড়ে মানুষের বসতি হাতির খাদ্যসংকট ও সংঘাত বাড়াচ্ছে। গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা ও বর্তমান হাতির সংখ্যা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।