চোর সন্দেহে রংপুরের তারাগঞ্জে শ্বশুর ও জামাতাকে পিটিয়ে হত্যার এক বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি মামলার তদন্ত। প্রায় ৭০০ অজ্ঞাতনামা আসামির মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁদের কয়েকজন জামিনে বেরিয়ে এসেছেন। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চললেও এখনো আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ। এতে বিচারপ্রক্রিয়া আটকে থাকায় দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনেরা।
গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে রূপলাল রবিদাস ও তাঁর জামাতা প্রদীপ দাসকে ভ্যান চোর সন্দেহে স্থানীয় লোকজন আটক করে পিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর রূপলাল মারা যান। পরদিন ভোরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রদীপও।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলের ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় সেসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়ায় এখনো জানা যায়নি, হামলায় জড়িত মোট কতজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি বর্তমানে তারাগঞ্জ আমলি আদালতে রয়েছে। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট না দেওয়ায় মামলাটি বিচার পর্যায়ে যেতে পারেনি। তবে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে আদালত থেকে তদন্ত কর্মকর্তাকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে প্রতি মাসে আদালতকে অবহিত করছে।
পুলিশের ভাষ্য, মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি থাকায় ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁদের শনাক্ত, পরিচয় যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে সময় লাগছে। নিরপরাধ কাউকে আসামি না করে প্রকৃত জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিতে এই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারাগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুদ বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরও যারা ঘটনায় জড়িত ছিল, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘এটি চাঞ্চল্যকর মামলা। আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। আসামিদের যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে। আগামী এক মাসের মধ্যে মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।’
গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে মিঠাপুকুর থেকে ভ্যান নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন প্রদীপ দাস। পরদিন রূপলালের বড় মেয়ে নূপুর রবিদাসের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার কথা ছিল। রাস্তা চিনতে না পেরে কাজীরহাট এলাকায় পৌঁছে শ্বশুর রূপলালকে ফোন করেন প্রদীপ। পরে দুজন একসঙ্গে ভ্যানে করে ঘনিরামপুর গ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন।
রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় কয়েকজন তাঁদের ভ্যান চোর সন্দেহে থামান। পরে লোকজন জড়ো হয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তা গণপিটুনিতে রূপ নেয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা সরে যেতে বাধ্য হন। পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ১০ আগস্ট রাতে ৭০০ জনকে আসামি করে তারাগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী।
নিহত রূপলাল পেশায় জুতা সেলাইকারী ছিলেন। তাঁর বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামে। আর প্রদীপ ভ্যান চালাতেন।
রূপলালের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে জয় রবিদাস এখন বাবার জুতা সেলাইয়ের পেশা ধরে সংসারের হাল ধরেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তারাগঞ্জ বাজারে জুতা সেলাই করে সংসার চালাচ্ছে সে।
জয় বলে, ‘বাবা নেই আজ এক বছর। সংসারের হাল ধরার কেউ নেই। তাই জুতা সেলাই করে চেষ্টা করছি দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে। আয় কম। দাদি-মায়ের ওষুধ আর চাল-ডালই হচ্ছে না দিনের কামাই দিয়ে।’
১৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্ত থেমে গেছে বলেও অভিযোগ করে জয়। তার ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন জামিনে বের হওয়ার পর হুমকি দিয়েছিলেন। তবে ভিডিও করে রাখার পর আর সমস্যা হয়নি।
ভারতী রানী বলেন, ‘যারা আমার স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা শুধু আমার স্বামীকে মারেনি, আমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি দ্রুত হত্যার বিচার চাই।’