সকাল ৭টা। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের সরু কাঁচা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি ভ্যান। ভ্যানের ওপর বসে পরিচিত কণ্ঠে হাঁক দেন আনিছার রহমান (৪৭)—‘কাঁঠাল বিক্রি করবেন... কাঁঠাল!’
ডাক শুনে বাড়ির মালিক বেরিয়ে এসে গাছের দিকে ইশারা করেন। আনিছার রহমান গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একে একে কাঁঠাল দেখে দরদাম করেন। দাম চূড়ান্ত হলে সঙ্গে থাকা শ্রমিক বাঁশের মই বেয়ে গাছে উঠে কাঁঠাল নামিয়ে আনেন। এরপর সেগুলো ভ্যানে তুলে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে আবার রওনা দেন পরের গ্রামের উদ্দেশে। কিছু দূর যেতেই আবার শোনা যায় একই হাঁক—‘কাঁঠাল বিক্রি করবেন... কাঁঠাল!’
এভাবেই কাটে কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাদ্রাসাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনিছার রহমানের প্রতিটি দিন। প্রায় ১৩ বছর ধরে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মৌসুমি ফল সংগ্রহ করছেন। আম, লিচু ও পেয়ারার মৌসুম শেষে এখন তাঁর ব্যস্ততা কাঁঠালকে ঘিরে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাত-আটটি গ্রাম ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচা কাঁঠাল কেনেন। তিন থেকে চার দিন ধরে সংগ্রহ করা কাঁঠাল পরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়।
আনিছার রহমান বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে আকারভেদে প্রতিটি কাঁঠাল ৫০ থেকে ৭০ টাকায় কিনি। তিন-চার দিন পরপর একটি চালান ঢাকায় পাঠাই। পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি চালানে আট থেকে ১০ হাজার টাকা লাভ হয়। তবে বাজার খারাপ হলে লোকসানও গুনতে হয়। তবু এই মৌসুমি ফলের ব্যবসাই এখন আমার প্রধান পেশা।’
তিনি জানান, দূরপাল্লায় পাঠানোর জন্য কেবল কাঁচা কাঁঠাল কেনা হয়। কারণ, পাকা কাঁঠাল পরিবহনের সময় সহজেই ফেটে যায় বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঢাকার আড়তে আকারভেদে একটি কাঁঠাল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, কখনো তারও বেশি দামে বিক্রি হয়। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাঁঠাল কেটে কোয়া হিসেবেও বিক্রি করা হয়।
দিনভর বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কাঁঠাল নির্দিষ্ট স্থানে এনে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে আকার অনুযায়ী বাছাই করে বিকেলে কাভার্ড ভ্যানে তোলা হয়। আবার রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে অনেক কাঁঠাল ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাসের লাগেজ বক্সেও পাঠানো হয়। রাত শেষ হওয়ার আগেই গঙ্গাচড়ার কাঁঠাল পৌঁছে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে।
শুধু আনিছার রহমান নন, গঙ্গাচড়া উপজেলায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন পাইকার বছরজুড়ে বিভিন্ন মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠান। কাঁঠালের মৌসুম এলেই তাঁদের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তাঁদেরই একজন গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের ধামুর এলাকার সবুজ মিয়া। প্রায় আট বছর ধরে তিনি মৌসুমি ফলের ব্যবসা করছেন। কাঁঠালের মৌসুমে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০টি, কোনো কোনো দিন এরও বেশি কাঁঠাল সংগ্রহ করেন। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা লাভ হয়। তবে বাজারে চাহিদা কমে গেলে একেকটি চালানেই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়।
সবুজ মিয়া বলেন, ‘গঙ্গাচড়ার কাঁঠালের চাহিদা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ভালো। তাই মৌসুমজুড়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। লাভ যেমন আছে, তেমনি বাজার খারাপ হলে বড় ধরনের লোকসানও হয়।’
উপজেলার চেংমারী, হাবু বালারঘাট, পশ্চিম মান্দ্রাইন, মৌলভীবাজার, নবনীদাস, দক্ষিণ কোলকোন্দ ও বেতগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়। শুধু বাণিজ্যিক বাগানেই নয়, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে এবং পতিত জমিতেও রয়েছে অসংখ্য কাঁঠালগাছ। বেলে দোআঁশ মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এখানে খাজা, রসাসহ বিভিন্ন জাতের কাঁঠালের ভালো ফলন হয়। স্থানীয়দের মতে, স্বাদ ও মিষ্টতার কারণে গঙ্গাচড়ার কাঁঠালের আলাদা কদর রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
গঙ্গাচড়া মেডিকেলপাড়া এলাকার নূরজাহান বেগম বলেন, ‘গাছের সব কাঁঠাল তো আর খাওয়া যায় না। তাই কিছু বিক্রি করে দিই। সেই টাকা দিয়ে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচের কিছুটা জোগাড় হয়, সংসারেও কাজে লাগে।’
বড়বিল ইউনিয়নের আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পাঁচটি কাঁঠালগাছ আছে। এ বছর সব গাছেই প্রচুর ফল ধরেছে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়েও অনেক কাঁঠাল বিক্রি করছি। শুধু আমি নই, এলাকায় অনেক পরিবারই মৌসুমে কাঁঠাল বিক্রি করে বাড়তি আয় করছে।’
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গঙ্গাচড়ায় বছরে প্রায় ৮৬৯ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাঠানো হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুবেল হুসেন বলেন, ‘কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। গঙ্গাচড়ার মাটি ও আবহাওয়া কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। প্রতিবছর ভালো ফলন হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় কাঁঠাল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষকের আয় বাড়ছে, একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে।’