রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বয়ানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য, বাদীর বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে। এজাহারের সময় নিয়েও রয়েছে গরমিল। আর বাদী বলছেন, এজাহারে কী আছে, তিনি জানেন না। আবার লাশগুলো উদ্ধারের রাতে বাড়িটির বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু কে তা বিচ্ছিন্ন করল, তার উত্তর নেই। স্বর্ণ উদ্ধারের স্থান ও প্রক্রিয়া নিয়েও পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলছে না।
এসব প্রশ্নের মধ্যেই মামলার তদন্ত থানা-পুলিশের হাত থেকে পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন তদন্ত করছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলী। তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কালকের (আজ) মধ্যে ভালো কিছু পাবেন।’
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গতকাল দেখা যায় স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়। কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় সেখানে নিহতদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। পরে আত্মার শান্তি কামনা করে ধর্মীয় আচার শেষে তাঁদের স্মরণে প্রার্থনা করা হয়।
মাছুয়াপাড়া এলাকার ওই বাড়ির ছাদ, চিলেকোঠা ও ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপতি গত ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন।
এ ঘটনার পরদিন রোববার রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। ওই দিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ওই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ।
মামলার এজাহারে কী লেখা আছে, তা জানেন না বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলা পুলিশেরা লিখছে, থানায়। লেখার পর সই নিছে। পড়ে দেখি নাই। লেখার সময় বসে ছিলাম। লেখা শেষে বলল, বাবু এখানে সই দাও।’
রোববার বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে এজাহারে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানান গোপীনাথ চক্রবর্তী। অথচ এজাহারে সময় লেখা আছে সকাল ১০টা ৩০ মিনিট।
মহানগর পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা জানান রোববার বেলা পৌনে ১টার দিকে।
এজাহারে বাদীর স্বাক্ষরের আগেই পুলিশ হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং দুজনকে আটকের কথা বললেও এজাহারে আটক দুজনের নাম নেই। এ বিষয়ে মামলার বাদী বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুজনের নাম এজাহারে নেই কেন, সেটা পুলিশ ভালো জানে।’
এজাহারে অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি কাগজ-কলমে যখন পেয়েছি, সেটাই দিছি, মামলা নিয়ে অসংগতির কী আছে। সাড়ে ১০টায় এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষে লেখায় আছে। বাদী কী বলে? কাগজে কলমে তো সাড়ে ১০টাই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর স্যারেরা সংবাদ সম্মেলন করে যেটা বলেছে, সেটাই। এর বেশি কিছু আমরা বলতে পারব না।’
হত্যায় শুধু দুজন জড়িত এবং ইয়াবা সেবনে বাধা পাওয়ায় তাঁরা হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এর পেছনে বড় কোনো চক্র আছে। পুলিশ যদি বলে, এই দুজনে জড়িত আর কেউ নয়; তাহলে কার বিচার কে করবে। ওইটা যদি পুলিশের শেষ কথা হয়, তাহলে বিচার কীভাবে সুষ্ঠু হবে। ডিবি, সিআইডি, পিআইবি—তাহলে এরা কী করে।’
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রতিটি মামলার এজাহার অভিযোগকারীর কথা অনুযায়ী লিখিত হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী জানেই না, সেখানে কী লেখা আছে। এজাহারের বক্তব্য, ঘটনাস্থলসহ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কাজেই সার্বিকভাবে অনেক প্রশ্ন সামনে আসছে। তাই এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।’
লাশ উদ্ধারের রাতে পুরো বাড়ি বিদ্যুৎবিহীন ছিল বলে জানান স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গণপতির বাড়ি থেকে ৫০ মিটার দূরে রাস্তার ধারে মন্দিরের প্রাচীরের মধ্যে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি থেকেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন ছিল। লাশ উদ্ধারের সময় মিস্ত্রি ডেকে সংযোগ ঠিক করা হয়।
সেই রাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ ঠিক করার কাজটি করেছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি উজ্জ্বল বর্মন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাত ১টার দিকে আমাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, বৈদ্যুতিক পিলারে মেইন তার থেকে মিটারের তার সম্পূর্ণ আলাদা। সংযোগটি ৩০ ফুট উঁচুতে ছিল। সম্ভবত বাঁশের গুঁতা দিয়ে বা টেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।’
মামলার বাদী বলেন, ‘বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে কাজ (হত্যা) করা হইছে। বিদ্যুৎ বন্ধ করল কারা? এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিশ্চয় আরও লোক ছিল। কেউ নিচে কাজ করছে, কেউ ওপরে কাজ করছে। দুজন ছেলেমানুষের পক্ষে চারজনকে খুন করা সম্ভব না।’
লাশ উদ্ধারের রাতে ৩টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে রেখে আটক পলাশ দাস নামে অপরজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সঙ্গে পলাশ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরদিন পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে, হত্যার পর স্বর্ণালংকার লুট করে মাছুয়াপাড়া মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখেছিলেন খুনিরা। পুলিশ সেখান থেকে উদ্ধার করে।
স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনার সাক্ষী দুলাল শর্মা। তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাটির বর্ণনা আর পুলিশ যেখান থেকে উদ্ধার করেছে, তার মিল নেই। এটা সাজানো হতে পারে। নাটকের মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখে আমার মনে হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা আগে খুঁড়ে পুঁতে রাখা। মাটি আলগা ছিল।’
চারজনের লাশের ময়নাতদন্তের কাজে নিয়োজিত ডোম যতন রায়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। লাশ উদ্ধারের ঘটনা উল্লেখ করে ভিডিওতে তিনি ইঙ্গিত দেন, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে সম্ভবত হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল কুমার বিশ্বাস বলেছেন, নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।
সার্বিক বিষয়ে ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আজকের পত্রিকাকে বলেন, দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসামিদের বক্তব্য পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিল রয়েছে।