প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ নীলফামারীর সৈয়দপুর-চিলাহাটি রেলপথের ৯ স্টেশনের মধ্যে ৫টি। ফলে একদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে পরিত্যক্ত স্টেশনগুলোর অবকাঠামো, লুপলাইন ও মূল্যবান রেলসম্পদ নষ্ট হচ্ছে এবং বেদখল হচ্ছে বিপুল ভূসম্পত্তি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এতে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হলেও স্টেশন চালু বা সম্পদ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। স্থানীয়দের মতে, বন্ধ স্টেশনগুলো খুলে দিয়ে লোকাল ট্রেন চালু করা গেলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সৈয়দপুর-চিলাহাটি রেলপথ রয়েছে সৈয়দপুর, খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, নীলফামারী, তরুণীবাড়ী, ডোমার, মীর্জাগঞ্জ ও চিলাহাটি নামে ৯টি স্টেশন। কিন্তু জনবলসংকটের কারণে খয়রাতনগর, দারোয়ানী, নীলফামারী কলেজ, তরুণীবাড়ী ও মীর্জাগঞ্জ স্টেশনের কার্যক্রম প্রায় ২০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী রুটে ৬ জোড়া আন্তনগর এবং একটি মেইল ট্রেন চলাচল করে। একসময় দুটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। তবে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ট্রেনগুলো চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সরেজমিন খয়রাতনগর ও দারোয়ানী স্টেশনে দেখা যায়, স্টেশন চত্বরে অবস্থিত আধা পাকা টিনশেডের কক্ষগুলো গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে। তবে এখানে যে একসময় স্টেশন ছিল, তার চিহ্ন বহন করে চলেছে টিকিট কাউন্টার, স্টেশনমাস্টারের কক্ষ ও যাত্রীদের বিশ্রামাগার। এসব এখন অরক্ষিত পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মজিবর রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে স্টেশনটি। এই স্টেশনে এখন আর ট্রেন থামে না। মানুষের পদচারণ না থাকায় গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে স্টেশন চত্বর। শুধু তা-ই নয়, রাতের অন্ধকারে স্টেশনে বসে মাদকের আখড়া। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। অথচ একসময় স্টেশনে সব ধরনের ট্রেন থামত এবং হাজারো মানুষ ওঠানামা করতেন। কাউন্টারে এতই ভিড় ছিল, সারিতে দাঁড়ানো ছাড়া টিকিট কাটা যেত না। ভিড় ঠেলে ট্রেনে উঠতে হতো। এখানকার যাত্রীরা সৈয়দপুর হয়ে পার্বতীপুর জংশন, ভবনীপুর, চরকাই, জয়পুরহাট ও শান্তাহার জংশন স্টেশন এলাকার বিভিন্ন হাটবাজারে মালপত্র আনা-নেওয়া ও যাতায়াত করতেন।
অহিদুর রহমান নামের আরেক বাসিন্দা জানান, এই স্টেশন থেকে উত্তরা ইপিজেডের দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। ইপিজেডের ভেতর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করে স্টেশনটি চালু করতে ইপিজেডের প্রধান কর্মকর্তা, নীলফামারী জেলা প্রশাসকসহ রেলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে স্টেশনটি আজও চালু হয়নি।
দারোয়ানী স্টেশন এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত হোসেন বলেন, একসময় ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই স্টেশন থেকে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে কেনা সবজি রাজধানীতে পাঠাতেন। স্টেশনটি চালু থাকায় এলাকাজুড়ে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ছিল বেশ প্রাণবন্ত। কিন্তু স্টেশনটি বন্ধ হওয়ার পর সেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি থেমে গেছে। স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, রেলপথটি ডাবল লাইন হলেও মাঝের কয়েকটি স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ক্রসিং সুবিধা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে এক প্রান্ত থেকে আসা ট্রেনকে অপর প্রান্তের ট্রেন নির্ধারিত স্টেশনে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে পুরো রেলপথের ট্রেন চলাচলের সময়সূচিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, বেদখল হচ্ছে রেলের সম্পত্তিও। তাঁর দাবি, এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন বলেন, উত্তরা লোকাল ট্রেনটি চিলাহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণ, বন্ধ স্টেশনগুলো চালু এবং উত্তরা লোকাল ও রকেট মেইল ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা হলে স্টেশনগুলো আবার সচল হবে। এতে যাত্রীসেবা উন্নত হবে, বিনা টিকিটে ভ্রমণ কমবে, রেলের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে, রাজস্ব বাড়বে এবং আন্তনগর ট্রেন চলাচলও আরও স্বাভাবিক হবে।