রংপুরের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, সেটি তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। উন্নয়নের সঙ্গে ভোট বা রাজনৈতিক আনুগত্যকে শর্তযুক্ত করা যাবে না—এমন মন্তব্য করেছেন রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা এ মন্তব্য করেন।
আজ মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রংপুর নগরীর জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, কোনো দলকে ভোট দেওয়ার ওপর উন্নয়ন নির্ভর করবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
৯ আগস্ট রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘রংপুরের লোকেরা, আমরা সব সময় পিছিয়ে পড়া। কেন পিছিয়ে পড়া? আমরা তো সঠিক জিনিসটাই বুঝি না। যখন বিএনপি সরকার আসবে তখন আপনারা করবেন জাতীয় পার্টি, যখন বিএনপি সরকার আসবে তখন আপনারা করবেন জামায়াত। তাহলে কেমনে হবে? পাবেন কেমনে?’
মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুরের মানুষ বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করায় উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকে—এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘ওনার মতো প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ঘোষিত বাক, ব্যক্তি ও মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী, পাশাপাশি রংপুরবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের বিপক্ষে অসম্মানজনক।’
মন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়নের জন্য একমাত্র বিএনপিকেই ভোট দিতে হবে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে দাবি করে সংসদ সদস্যরা বলেন, ‘উন্নয়নের জন্য একমাত্র বিএনপিকেই ভোট দিতে হবে, যা একদলীয় শাসন কায়েমেরই নামান্তর। উন্নয়নের জন্য ক্ষমতাসীন দলকেই ভোট দিতে হবে এটা কোনো শর্ত হতে পারে না বরং এটা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম দায়িত্ব দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সেই বিবেচনায় পিছিয়ে থাকা রংপুর অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা এই জনপদের মানুষ প্রত্যাশা করেন।
রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা কোনো অঞ্চলের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক অধিকার।’
তাঁদের বক্তব্য, জনগণের ভোট কোনো সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শর্ত হতে পারে না। সরকার ক্ষমতায় থাকবে জনগণের জন্য, জনগণের করের অর্থে এবং রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে। ফলে কোনো অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করলে তাঁদের উন্নয়ন ব্যাহত হবে—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন-সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে বৈষম্যের অবসান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
এগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে সংসদ সদস্যরা বলেন, রংপুরের মানুষ কোন দলকে ভোট দিয়েছেন বা দেবেন, তার সঙ্গে উন্নয়নকে শর্তযুক্ত করা যুক্তিসংগত নয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা বলেন, ‘আমরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তাঁর কাছে দাবি জানাচ্ছি, তিনি যেন রংপুরবাসীর রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখান এবং এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাহার করেন।’
একই সঙ্গে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, রংপুরের উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার নয়। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রংপুরের মানুষ সমান অধিকার ও ন্যায্য উন্নয়নের দাবিদার। দল-মত নির্বিশেষে তাঁদের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম, গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ও গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছ উপস্থিত ছিলেন।