মাটির উঠান, ধোঁয়া ওঠা চুলা আর দুই হাতের নিখুঁত ছন্দ—এই তিনেই বদলে গেছে রংপুরের তরুণ রাহেদুল ইসলাম নাহিদের জীবন। যে হাতে একদিন ছিল অভাবের হিসাব, আজ সেই হাতের রান্নার দৃশ্য মুগ্ধ করে বিশ্বের কোটি মানুষকে। তবে খ্যাতির আলোয় দাঁড়িয়েও নাহিদের মনে রয়ে গেছে ফেলে আসা দিনগুলোর শঙ্কা; কারণ, দারিদ্র্যের স্মৃতি কখনো কখনো সাফল্যের চেয়েও গভীর ছাপ রেখে যায়।
পীরগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত হরগোবিন্দ গ্রামের একটি সাধারণ উঠান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর অসাধারণ যাত্রা। মাটির চুলায় রান্না, দেশি উপকরণের নান্দনিক উপস্থাপন, গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর নৃত্যের মতো ছন্দময় হাতের ভঙ্গি—এসব মিলিয়ে নাহিদের ভিডিও হয়ে উঠেছে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা রান্নার এক জীবন্ত গল্প।
তাঁর ভিডিওতে মানুষ খুঁজে পায় গ্রামের চেনা গন্ধ, মায়ের স্মৃতি, বাবার সংগ্রাম আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক তরুণের সাহস। তাই ছোট্ট একটি গ্রামীণ উঠান থেকে শুরু হওয়া নাহিদের পথচলা আজ পৌঁছে গেছে দেশ-বিদেশের কোটি মানুষের কাছে।
১৯৯৭ সালে জন্ম নেওয়া নাহিদের জীবন শুরু হয়েছিল অন্য দশটা সুখে থাকা শিশুর মতোই। দাদার রেখে যাওয়া ২৫ বিঘা জমির বিশাল অংশ ছিল তাঁদের পরিবারের। বাবা মৃত আব্দুস সামাদ ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বড় ছেলে। চার বোন ও তিন ভাইয়ের পরিবারে নাহিদ ছিলেন সবার ছোট। অভাব তখন তাঁদের ছায়াও মাড়াতে পারেনি।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে নাহিদের জন্মের পরপরই উল্টে যেতে শুরু করে ভাগ্যের চাকা। জন্মের কিছুদিন পরই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর মা সুফিয়া বেগম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মাতৃহারা ছোট্ট নাহিদকে বুকে আগলে বড় করেন দাদি সোবাতন নেছা। এদিকে অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা আর সরল স্বভাবের কারণে বন্ধু-স্বজনদের আবদার রাখতে গিয়ে বাবা একের পর এক পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করেন। পরিকল্পনাহীনতার সেই দিনে একটু একটু করে ফুরিয়ে যেতে থাকে তাঁদের জমির পরিমাণ, আর পরিবারে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
এসএসসি পাসের পর ২০১৪ সালের শেষ দিকে বুকভরা স্বপ্ন ও কষ্ট বুকে নিয়ে নাহিদ চলে আসেন ঢাকায়। ভর্তি হন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল বিভাগে। রাজধানীর কঠিন পিচঢালা পথে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। প্রথমে খালার বাসায় আশ্রয় মিললেও দীর্ঘদিন বিনা আয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। সারা দিন বাইরে কাটিয়ে রাতে ফিরে মিথ্যা বলতে হতো—‘টিউশনি করছি, টাকা পেলেই দেব’। অথচ পকেটে এক টাকাও ছিল না।
অবশেষে এক বিদেশফেরত সরকারি কর্মকর্তার আনুকূল্যে এবং পরবর্তীকালে একটি টিউশনি জুটে যাওয়ায় ভাগ্যের চাকা সামান্য ঘোরে। নিজের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতেও টাকা পাঠাতে শুরু করেন। তবে একা থাকার সুবাদে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হতো—তখন কি আর কেউ জানত, এই রান্নাঘরই একদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠবে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় পা রাখার অনেক আগে নাহিদ ছায়ানট থেকে ‘ভরতনাট্যম’ নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই শাস্ত্রীয় নৃত্যের তাল, লয়, শৃঙ্খলা আর নিখুঁত অঙ্গভঙ্গিই আজ তাঁর রান্নার ভিডিওকে অন্য সব কনটেন্টের চেয়ে আলাদা করেছে।
সকালের প্রথম আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাঁর কর্মযজ্ঞ। নিজেই হাতে ঝাড়ু নিয়ে উঠান পরিষ্কার করেন, কাদা-মাটি দিয়ে নিপুণ হাতে লেপে দেন মেঝে। এরপর সারি দিয়ে সাজানো হয় ঝকঝকে হাঁড়ি-পাতিল। বাঁশের ডালায় কাঁচা লাউ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, রসুন ও পুকুর থেকে ধরা তাজা মাছ সাজিয়ে তোলার সেই আয়োজনই যেন কোনো নাটকের মঞ্চ প্রস্তুতি। মাটির চুলায় খড় ও গোবরের জ্বালানির ধোঁয়া, মাছ কাটা আর মসলা বাটার প্রতিটি নড়াচড়ায় থাকে এক অদৃশ্য নৃত্যের ছন্দ। ভিডিওর শেষে কলাপাতায় খাবার পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে এক নিখুঁত লোকজ নাটকের।
মাটির চুলায় আগুন ধরানো হয় শুকনো খড়, কাঠ আর গোবরের তৈরি ঐতিহ্যবাহী জ্বালানিতে। ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উড়ে যায়। নাহিদ কখনো আগুনে ফুঁ দেন, কখনো কাঠ একটু ভেতরে ঠেলে দেন। তারপর শুরু হয় মাছ পরিষ্কার করা, সবজি কাটা, মসলা বাটা। তাঁর হাতের প্রতিটি নড়াচড়ায় এমন এক ছন্দ, যা চোখ সরাতে দেয় না। মনে হয় না তিনি কেবল রান্না করছেন; মনে হয় যেন কোনো অদৃশ্য মঞ্চে নিঃশব্দ একটি নৃত্য পরিবেশন করছেন।
রান্নার পুরো সময়জুড়ে তাঁর কোনো তাড়াহুড়ো নেই। মসলা কড়াইয়ে পড়ার শব্দ, ফুটতে থাকা ঝোলের বুদ্বুদ, চুলার আগুনের খসখস আওয়াজ আর পাখির ডাক-সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ। ভিডিওর শেষে কলাপাতায় সাজিয়ে পরিবেশন করা হয় রান্না। ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু দর্শকের মনে থেকে যায় গ্রামের সেই শান্ত উঠান, ধোঁয়া ওঠা চুলা আর নাহিদের দুই হাতের অনবদ্য ছন্দ।
রান্নার ফাঁকেই কথা হয় নাহিদের সঙ্গে। কড়াইয়ে তখন ফুটছে মাছের ঝোল। মাঝেমধ্যে নেড়ে দিচ্ছেন, আবার আগুনে কাঠ ঠেলে দিচ্ছেন। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান। যেন স্মৃতির ভেতর ডুবে যান কিছুক্ষণের জন্য।
২০২৩ সালে টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন ভিডিও নির্মাণ। বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও হারিয়ে যাওয়া জীবনযাপনকে ক্যামেরাবন্দী করাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু ঠিক যখন সাফল্যের সুবাস পেতে শুরু করেছেন, তখনই জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে। ২০২৪ সালে বাবা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেননি তিনি, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকেও মেলেনি কোনো সাহায্য। শেষ পর্যন্ত অর্থাভাবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবাকে হারাতে হয়।
বাবার মৃত্যুর সেই গভীর শোক আর ঋণগ্রস্ত অসহায়ত্বের মাঝেই যেন অলৌকিকভাবে মোড় নেয় তাঁর জীবন। একের পর এক ভাইরাল হতে শুরু করে তাঁর রান্নার ভিডিও। মাটির চুলা, গ্রামীণ উঠান আর হাতের জাদুকরী ছন্দ মুগ্ধ করে তোলে দেশ-বিদেশের কোটি মানুষকে।
আজ ‘নাহিদ অফিশিয়াল’ ফেসবুক পেজে তাঁর অনুসারী প্রায় ৩১ লাখ। ফেসবুক ও ইউটিউব মিলিয়ে তাঁর মোট ভিউ ছাড়িয়ে গেছে এক শ কোটি। এই কনটেন্ট নির্মাণই এখন তাঁর ১০ সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। যে ছেলেটি বাবার চিকিৎসার একটি টাকা জোগাড় করতে পারেননি, আজ তিনি পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
নাহিদের এই মাটির উঠান এখন কেবল গ্রামের ঘর নয়, দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের তীর্থস্থান। গাইবান্ধা থেকে ছুটে আসেন সাধারণ মানুষ, আবার চীন থেকে প্রকৌশল পড়া শেষ করে ছুটিতে দেশে ফিরে বন্ধুরা দল বেঁধে আসেন তাঁর রান্নার ঘ্রাণ নিতে। কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল হামিদ ও স্থানীয়রা গর্ব করে বলেন, নাহিদ আজ শুধু রংপুরের নন, পুরো বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন।
পাশের গ্রামের তরুণ মামুনুর রাশিদ বলেন, নাহিদ শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নন, তিনি তাঁদের এলাকার গর্ব। তাঁর ভিডিওর মাধ্যমে রংপুরের গ্রামের পরিচয় আজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
চীনে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করা সৌমিক সাহসও ছুটিতে দেশে ফিরে বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন নাহিদের বাড়িতে। তাঁর ভাষায়, ভিডিওতে দেখা পরিবেশ বাস্তবেও ঠিক তেমনই-পরিপাটি মাটির উঠান, ঐতিহ্যবাহী রান্নাঘর আর নির্মল প্রকৃতি। মনে হয়েছে, নাহিদ শুধু রান্না নয়, বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিকেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরছেন।
কোটি মানুষের প্রিয় মুখ হয়ে উঠলেও নাহিদের চোখেমুখে বিলাসী জীবনের কোনো অহংকার নেই। উল্টো ছোটবেলার দারিদ্র্যের ক্ষত তাঁকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, মাঝেমধ্যে হ্যাকারদের কবলে পড়ে ইউটিউব চ্যানেল হারানোর কষ্ট কিংবা কিছু অসাধু চক্রের মিথ্যা কপিরাইট স্ট্রাইকের কারণে তাঁর পেজটি নষ্ট হওয়ার হুমকি আসে। ১০ সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই পেজটি নিয়ে তিনি সব সময় এক অজানা আশঙ্কায় থাকেন—যদি কোনো কারণে এটি হারিয়ে যায়, তবে পরিবার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন তিনি?
তবু সব শঙ্কা পেছনে ফেলে নাহিদ হেঁটে যেতে চান মাটির সুবাস মাখা আপন পথে। বিলাসবহুল জীবনের মোহ নেই তাঁর, কেবল কঠোর পরিশ্রমে গ্রামের এই স্নিগ্ধতা ও মানুষের ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চান আজীবন।