রংপুরের পীরগাছায় নোবেল রেসিডেন্সিয়াল মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে ঘিরে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। এরই মধ্যে বিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষক নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকেরা।
আজ শনিবার সকালে বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্যত্র ভর্তি হওয়ার জন্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বিদ্যালয়ে জড়ো হন। একই দিন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক আল আমিন মিয়াকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়। এ সময় কয়েকজন অভিভাবক জানান, ভালো ফলাফল ও পাঠদানের মানের কারণে তাঁরা সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কিছু শিক্ষকের চলে যাওয়া এবং পাঠদান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
অভিভাবক রঞ্জু মিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ে কয়েক মাস পর অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। এমন সময়ে বিদ্যালয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী চলে গেছে। তাই মেয়েকেও আর এখানে পড়াতে চাচ্ছি না। টিসি নিতে এসেছি।’
কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, ‘ভালো ভালো শিক্ষকেরা এখান থেকে চলে গেছেন। এখানে এখন গ্রুপিং চলে। আমাদের সহপাঠীরা অনেকেই চলে গেছে। তাই আমরাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
জানা গেছে, ২০১০ সালে আতাউর রহমান, আল আমিন মিয়া, রেজাউল করিম উজ্জ্বল ও মোহাম্মদ ইউসুফ—এই চার বন্ধু মিলে উপজেলার চন্ডিপুরে ‘নোবেল কোচিং সেন্টার’ চালু করেন। পরে সেটিকে বিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হয়। পীরগাছা বাজারের আব্দুল করিম শিক্ষা নিকেতনে এর অস্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ২০২০ সালে নোবেল রেসিডেন্সিয়াল মডেল উচ্চবিদ্যালয় পাঠদানের স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠার পর ভালো ফলাফলের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করে।
বিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৭২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। তাদের মধ্যে ৪৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলাফলের দিক থেকে এ বছর পীরগাছা উপজেলায় প্রথম এবং দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ষষ্ঠ হয়েছে বলে দাবি বিদ্যালয়টির। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী ও ৩২ জন শিক্ষক রয়েছেন।
তবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের নামে জমি কেনা এবং সাবেক সভাপতি মারুফ পারভেজকে ঘিরে প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের সঙ্গে অপর উদ্যোক্তাদের মতবিরোধ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ ইউসুফকে পুনরায় পাঠদানে ফেরানোর বিষয়টি। সংশ্লিষ্টদের দাবি—দুই বছর আগে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও গোপনে বিয়ের অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছিল।
এই বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোক্তাদের মধ্যে মতবিরোধ চলছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তা প্রকাশ্যে এলে বিদ্যালয়ে বিভাজন তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের এক পক্ষ প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করে, অন্য পক্ষ তাঁর পক্ষে মিছিল করে। পরে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষকদের একাংশ পীরগাছা সরকারি কলেজ গেটসংলগ্ন সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন ক্যাম্পাসে ক্লাস নেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের সংকট আরও প্রকাশ্যে আসে।
আজ ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ভিড়ের খবর পেয়ে বিদ্যালয়ে যান সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা। পরে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান সভাপতির কাছে লিখিত অব্যাহতি পত্র দেন। সভাপতি তা গ্রহণ করে আল আমিন মিয়াকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আল আমিন মিয়া বলেন, ‘আতাউর রহমান কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে অন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। ওই অভিযোগ ও তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
তবে আতাউর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে এবং সভাপতির আহ্বানে আমি অব্যাহতিপত্র জমা দিয়েছি। আমি চাই, তিলে তিলে গড়ে তোলা আমার প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটির সংকট দ্রুত দূর হোক।’ তিনি দাবি করেন, তিনি আলাদা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত নন। এই বিদ্যালয় থেকে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষককে দুই সপ্তাহ আগে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারাই মূলত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে তিনি জানেন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের অব্যাহতির আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের চলমান সংকট নিরসনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, ‘বিদ্যালয়টি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাঁদের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। তাঁরা যেভাবে পরিচালনা করবেন, সেভাবেই চলবে। তবে কোনো অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’