ছাদজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। কোথাও লোহার রড দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও পড়ে আছে বাঁশ-কাঠের টুকরা। এক পাশে পানির ট্যাংক, অন্য পাশে ছোট একটি চিলেকোঠা। সবই আছে—শুধু নেই সেই মানুষটি, যার পদচারণায় এই ছাদটুকু প্রতিদিন প্রাণ ফিরে পেত।
আজ সোমবার গিয়ে দেখা গেল, চিলেকোঠার টিনের চালে পাশাপাশি বসে আছে একঝাঁক কবুতর। কেউ নিশ্চুপ, কেউ ঠোঁট দিয়ে নিজের পালক গোছাচ্ছে। কয়েকটি গা ঘেঁষে বসে আছে। যেন অচেনা এই নীরবতার মধ্যেও তারা খুঁজছে পরিচিত মানুষটির অপেক্ষা।
এই ছাদেই কবুতর পালন করতেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। প্রতিদিন নিজের হাতে খাবার দিতেন পাখিগুলোকে। তাদের দেখাশোনা ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। তাঁর হাতের খাবারে অভ্যস্ত পাখিগুলোর কাছে ছাদটি ছিল শুধু আশ্রয় নয়, ছিল আপন এক ঠিকানা।
কিন্তু সেই মানুষটি আর নেই। স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম, মেয়ে আগামীসহ তাঁকেও হত্যা করা হয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় একই পরিবারের চারজনের মরদেহ। তাদের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় সেই ছাদেই—যে ছাদে তিনি এত দিন কবুতরগুলোর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।
চারজনের মৃত্যুতে বাড়িটি এখন নিস্তব্ধ। অথচ ছাদটি ছেড়ে যায়নি কবুতরগুলো। আজ সোমবার মাছুয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির মূল ফটকের সামনে সারিবদ্ধ চেয়ারে পোশাকধারী পুলিশ সদস্য বসে আছেন। বাড়িটি পাহারা দিচ্ছেন তাঁরা। মূল ফটক তালাবদ্ধ।
মূল ফটকের ভেতরে দুই পাশে দুটি নারকেলগাছ। গাছ দুটি ফটক ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে। পুলিশি বাধায় বাড়ির ভেতরে ঢোকার সুযোগ না থাকায় পাশের নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের নিচে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলা, তৃতীয় ও চতুর্থতলা চারদিক থেকে খোলা। দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় সেখানে একজন ভাড়াটে থাকেন। প্রথম তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠলে স্পষ্ট দেখা যায়, পাশের ভবন থেকে নিহত শিক্ষকের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব। দুই ভবন একেবারেই পাশাপাশি। সেখান থেকেই কবুতরগুলোর দেখা মেলে।
ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে কবুতরগুলো কিছুটা সরে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে আসছে আগের জায়গায়। একসঙ্গে গা ঘেঁষে বসে থাকা পাখিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়—নিরাপদ আশ্রয়টি তারা এখনো ছেড়ে যেতে চাইছে না।
প্রতিবেশী গৃহবধূ সোনালী রানী বলেন, লাশ উদ্ধারের পর থেকে বাড়িটা যেন বদলে গেছে। নেই গণপতি চক্রবর্তীর পরিচিত পায়ের শব্দ, নেই তাঁর হাতে খাবার নিয়ে ছাদে ওঠা। তবু কবুতরগুলো সেখানেই রয়ে গেছে। নিয়মিত খাবার দেওয়ার মানুষটি না থাকলেও তারা ছাদ ছাড়েনি। হয়তো তারা জানে না, যে মানুষটির অপেক্ষায় তারা প্রতিদিন ছাদের চালে বসে আছে, সেই মানুষটি আর কোনো দিন খাবার হাতে তাদের কাছে ফিরবেন না।
স্বজনেরা জানান, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। উদ্বিগ্ন স্বজনেরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে সম্পন্ন হয় চারজনের শেষকৃত্য।
একই চিতায় শেষবিদায় নেয় একটি পরিবারের চারজন মানুষ। আর তাদের বাড়ির ছাদে পড়ে থাকে শুধু কয়েকটি কবুতর—যাদের কাছে এখনো হয়তো গণপতি চক্রবর্তীর ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি।
এ ঘটনায় শনিবার রাতেই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২-এ তাঁদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
এর আগে গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ আবদুল মাবুদ বলেন, ছাদে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেছিলেন। পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধ বা শত্রুতা ছিল না। হত্যার পর আসামিরা ওই বাসায় অবস্থান করেন, গোসল করেন এবং খেজুর ও শসা খান বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন।