কাঁধে লাঠি। লাঠির এক পাশে মাছ ধরার জাল, অন্য পাশে মাটির কলস আর পুরোনো একটি লুঙ্গি। চোখেমুখে হতাশার ছাপ। যমুনেশ্বরীর তীরে মাছ ধরতে বেরিয়েছেন দ্বিজেন চন্দ্র দাস। সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা, অথচ নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর।
দ্বিজেনের মতো এই পাড়ার প্রায় ২৫০টি পরিবারের জীবনও নদীর মাছের ওপর নির্ভরশীল। নদীতে মাছ কমে গেছে, বেড়েছে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম। তাই অন্যদের ঘরে যখন উৎসবের প্রস্তুতি, জেলেপল্লিতে তখন হিসাব—কীভাবে কাটবে আরেকটি দিন।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের জলুবার এলাকায় যমুনেশ্বরীর তীরে এই জেলেপল্লি। কারও কাঁচা টিনের এক ঘর, কারও দুই ঘর। অনেকের নিজের জমি নেই, নেই বসতভিটাও। নদীতে মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বাহাগিলি থেকে বদরগঞ্জের কালারঘাট পর্যন্ত তারাগঞ্জের এই অংশে যমুনেশ্বরীর বিভিন্ন এলাকায় মাছ শিকার করে জেলেপাড়ার প্রায় ২৫০টি পরিবার।
আজ বৃহস্পতিবার জলুবারের জেলেপল্লিতে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন জেলের সঙ্গে। তাঁদের সবার কথায় উঠে আসে মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপের কথা। সামনে পূজা হলেও অধিকাংশ পরিবার এখনো কেনাকাটা করতে পারেনি।
দ্বিজেন চন্দ্র দাস বলেন, আগে নদীতে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন আর তা পাওয়া যায় না। তাঁর ভাষায়, আমরা মাছ ধরিয়েই দিন কাটাই। কিন্তু এখন আগে যেরকম মাছ ছিল, এখন ওরকম মাছ পাওয়া যায় না।
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে দ্বিজেন বলেন, ‘এমন কোনো জিনিস নাই যে আগের চেয়ে দুই টাকা বা এক টাকা কমতি আছে, কিন্তু সব বাড়তির মুখে। কিন্তু আমরা যেভাবে নদীতে মাছ পাইতেছি, সেভাবে সংসার চলে না। খুব কষ্টে আছি।’
মাছ ধরার এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করার সুযোগও নেই তাঁর। দ্বিজেন বলেন, ‘পেশা ছাড়িয়া কী করব? আমরা তো ভূমিহীন। ঘর তো নাই। কী করে খাব? মাছ মারা ছাড়া তো কোনো উপায় নাই।’
জেলেদের অভিযোগ, তাঁরা সরকারি সহায়তাও ঠিকমতো পান না। দ্বিজেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমরা জানি না উপরের র্যাংকের লোক কাকে ধরতে হবে বা কে আমাদেরকে দেবে।’ নদী ও মৎস্যসম্পদ-সংক্রান্ত সরকারি সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রমে সুযোগ না পাওয়ার কথাও জানান তিনি।
জেলে হৃদয় চন্দ্র দাসের সংসারেও একই রকম সংকট। তিনি বলেন, ‘মাছ মারি খাই। এখন চালের যত দাম। এক সের, দেড় সের করি চাল কিনে নিয়ে খাই আমরা। সামনে পূজা, স্ত্রী-সন্তান বায়না ধরছে, কিন্তু নতুন জামা কিনার সামর্থ্য নাই।’
তিনি জানান, দিনে কখনো আধা কেজি, কখনো তিন পোয়া মাছ পাওয়া যায়। সেগুলো বিক্রি করে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই খাবার জোটাতে হয়। সামনে পূজা হলেও এখনো কেনাকাটা করতে পারেননি তাঁরা। হৃদয়ের প্রশ্ন, ‘টাকা-পয়সা নাই, এখন কী দিয়ে কেনাকাটা করবে?’
প্রলাদ চন্দ্র দাসের সংসারে এক মেয়ে ও তিন ছেলে। মাছ ধরার পাশাপাশি ভাঙাচোরা একটি ভ্যান চালান তিনি। তবু সংসারের খরচ সামলানো কঠিন। পূজার কেনাকাটা করতে পারেননি তিনিও। প্রলাদ বলেন, ‘উৎসব-আনন্দ আছে, থাকিয়া কী? টাকা-পয়সার দরকার আছে। এখন টাকা-পয়সা হাতে না থাকলে কেমন করে উৎসব করব?’
জেলেপল্লির আরেক বাসিন্দা শিমুতি দাস জমিতে কাজ করে সংসার চালান। কখনো তিন মাস, কখনো ছয় মাস কাজ মেলে। স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১০ বছর আগে। মাসে ১ হাজার ৯০০ টাকা বিধবা ভাতা পান তিনি।
শিমুতি বলেন, ‘সরকারি যে ভাতা পাই তাক ঈদে ঈদে দেয়। পূজাত পাইনো না, তাই আনন্দও নাই। যে টাকা দেয় তা দিয়া তো জীবন চলে না। হামরা খুব কষ্টে আছি।’
উপজেলার সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তারাগঞ্জে ৬০০ জন মৎস্যজীবী রয়েছে। তাঁদের অর্ধেকই জলুবার জেলেপাড়ায়। তাঁরা দরিদ্র। আমরা আমাদের বিভাগে আপদকালীন জেলেদের পুনর্বাসন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু ওটা ওই অবস্থাতেই আছে। জেলেরা সহযোগিতা পেলে তাঁরা অনেকটাই উপকৃত হতো।’