হোম > সারা দেশ > রংপুর

জনসেবায় সর্বস্ব হারিয়েও জনগণের ভালোবাসায় ধন্য ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল চৌধুরী

মিফতাহুল ইসলাম, পীরগঞ্জ (রংপুর)

সাইদুর রহমান চৌধুরী দুলাল। ছবি: আজকের পত্রিকা

জনসেবায় তৃপ্তি পেয়েছেন বটে, কিন্তু এর জন্য খুইয়েছেন প্রায় ৯ একর পৈতৃক জমি। এ ছাড়া পীরগঞ্জ উপজেলার ধুলগাড়ীর ৪টি রাইস মিল, ২টি মিনিবাসসহ কোটি টাকার সম্পদও খুইয়েছেন। উল্টো আছেন মোটা অঙ্কের ঋণে। বলছিলাম সাইদুর রহমান চৌধুরী দুলালের কথা। তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ৮ নম্বর রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান।

জনসেবা মানে ক্ষমতার মোহ নয়, বরং ত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্য—এরই জীবন্ত উদাহরণ চেয়ারম্যান দুলাল চৌধুরী। আজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে তিনি সহায়-সম্পদ সবকিছুই বিলিয়ে দিয়েছেন। ক্ষমতা বা বিত্তবৈভবের মোহ তাঁকে কখনো ছুঁতে পারেনি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভালোবাসাই তাঁর জীবনের একমাত্র ও পরম প্রাপ্তি।

১৯৫৭ সালের ২৮ মে পীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ধুলগাড়ী গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন সাইদুর রহমান চৌধুরী দুলাল। তাঁর বাবা মরহুম আব্দুল কাদের চৌধুরী ওরফে বাচ্চা মিয়া ও মাতা মরহুমা সৈয়দুন্নেছা বেগমের ঘরে তাঁরা ৪ ভাই, ৪ বোন জন্ম নেন। দুলাল চৌধুরীর দাদা খড়কু মোহাম্মদ এবং দাদি ওলিমননেছা। ওই পরিবারেই জন্ম নেন পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত মতিয়ার রহমান চৌধুরী। দুলাল চৌধুরীর ভাই ও বোনেরা হলেন আব্দুল হামিদ মিয়া, আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া, আলতাফ হোসেন মিয়া এবং শাহিদা খাতুন, ছালেহা বেগম, সুলতান নাহার ও শাহানারা বেগম।

রায়পুর ইউনিয়নের নখারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষ করে ১৯৭৩ সালে চান্দেরবাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৫ সালে পীরগঞ্জ শাহ আব্দুর রউফ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন দুলাল চৌধুরী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই কন্যাসন্তানের জনক এবং সফলভাবে তাঁদের বিয়েও দিয়েছেন।

দুলাল চৌধুরীর জ্যাঠাতো ভাই রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মতিয়ার রহমান চৌধুরী। তিনি ইউপি সদস্য, ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানও ছিলেন। চৌধুরী বাড়ী থেকেই প্রায় ৪১ বছর ধরে রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানি পরিচালিত হয়ে আসছে।

১৯৮৩ সালে দুলাল চৌধুরী প্রথমবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০৩ এবং ২০১৭ সালে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পীরগঞ্জ পৌরসভার সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত মামলার কারণে ২০১৭ সালের পর ইউপি নির্বাচন না হওয়ায় তিনি বর্তমানেও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রায় ২২ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দুলাল চৌধুরী তাঁর ইউনিয়নে জনসংখ্যা-সংক্রান্ত কাজে বিশেষ অবদান রাখায় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০১৯ সালে উপজেলা পর্যায়ে এবং ২০২২ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচিত হন।

রাজনীতি ও জনসেবা যে ব্যবসার জায়গা নয়, ত্যাগের স্থান—দুলাল চৌধুরীর জীবন তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। মানুষের সেবা করতে গিয়ে তিনি তাঁর পৈতৃক ও মূল্যবান সম্পত্তি একে একে বিক্রি করে দিয়েছেন। তাঁর বাবা তাঁকে ধুলগাড়ী মৌজায় ৭ একর ২০ শতক, কুমারগাড়ী মৌজায় ১ একর ৯৭ শতক এবং খষ্ট্রি মৌজায় ২ একর ৯৭ শতক মোট ১২ একর ১৪ শতাংশ জমি দলিল করে দেন। কিন্তু তিনি জনসেবা করতে গিয়ে প্রায় ৯ একর জমি বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বসতভিটাসহ মোটে ৩ একরের মতো জমি তাঁর রয়েছে।

দুলাল চৌধুরী তাঁর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানের মসজিদ ও মাদ্রাসায় ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নিয়মিত সহায়তা প্রদান করেছেন। তাঁর সহায়তাগুলো এলাকার মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর এই জীবনযাত্রা আমাদের শেখায়—ক্ষমতার চেয়ার ভোগের নয়, ত্যাগের ও দায়িত্ব পালনের জায়গা। নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত জনসেবা। দুলাল চৌধুরী আজ হয়তো আর্থিকভাবে শূন্য হাতে বিদায় নেওয়ার পথে, কিন্তু তিনি জনগণের হৃদয়ের মণিকোঠায় এক অমর ও চিরজাগরূক জননেতা হয়ে থাকবেন। প্রায় ৭০ বছরের দুলাল চৌধুরীর শরীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানান রোগ বাসা বেঁধেছে। শরীরে না থাকলেও মনের ভেতর মানুষের সেবা করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর এখনো রয়ে গেছে।

দুলাল চৌধুরী তাঁর অতীতের ত্যাগের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে সততা ও লোককল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে চেয়ারম্যানি করেছি। গরিবের বরাদ্দ আত্মসাৎ করিনি। জনসেবা করতে গিয়েই কোটি কোটি টাকার সম্পদ খুইয়েছি! আজ শূন্য হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে। তবে একটাই সান্ত্বনা—জনগণ আমাকে ভালোবাসে, আমিও জনগণকে ভালোবাসি এবং এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।’