রংপুরের গঙ্গাচড়া বাজার থেকে রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার সড়ক। এর দুই পাশে ৪০-৪৫ বছর আগে রংপুর জেলা পরিষদের উদ্যোগে দেড় হাজারের বেশি গাছ রোপণ করা হয়। সেই গাছগুলো এখন পথচারী ও যানবাহনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সামান্য ঝড়-বৃষ্টি বা দমকা বাতাসেই গাছ উপড়ে পড়ছে কিংবা বড় বড় ডাল ভেঙে সড়কে পড়ছে। এতে গত এক বছরে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১৫ থেকে ২০ জন।
সম্প্রতি সরেজমিনে গঙ্গাচড়া বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় পর্যন্ত পুরো সড়ক ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অনেক গাছ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে এবং বড় বড় মরা ডাল ঝুলে রয়েছে। কোথাও কোথাও গাছের গোড়া ফেটে গেছে, আবার কিছু গাছ একদিকে হেলে পড়েছে। কয়েকটি স্থানে শুকিয়ে যাওয়া ডাল সড়কের ওপর ঝুঁকে থাকায় যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সড়কের পাশেই রয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বৈদ্যুতিক সংযোগের তার। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো অপসারণ বা ছাঁটাইয়ের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। মেহগনি, রেইনট্রি, আকাশমণি, কড়ই, আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে এখানে। বার্ধক্যের কারণে শুকিয়ে গেছে, আবার অনেক গাছের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক বছরে গাছ উপড়ে ও ডাল ভেঙে পড়ার ঘটনায় অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ৮ অক্টোবর গঙ্গাচড়া উপজেলার বিদিতর (তুলশিরহাট) গ্রামের ব্রজেন চন্দ্র সরকারের স্ত্রী ও স্কুলশিক্ষক কৃষ্ণা রানী সরকার এবং তাঁদের মেয়ে রাজশ্রী সরকার গাছের ডাল ভেঙে পড়ে নিহত হন। এ ছাড়া কয়েক মাস আগে গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের আরাজিনিয়ামত এলাকায় একটি গাছ উপড়ে পড়ে রংপুর নগরীর এক বাসিন্দার মৃত্যু হয়। অপর একটি ঘটনায় রংপুর নগরীর কদমতলী এলাকায় গাছের ডাল ভেঙে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
রংপুর নগরীর চব্বিশ হাজারী এলাকার বাসিন্দা আবদুল বাকি বলেন, ‘রাস্তার ধারের এই গাছগুলোর বয়স ৪০-৪৫ বছর। বয়সের কারণে অনেক গাছ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামান্য বাতাসেই বড় বড় ডাল ভেঙে পড়ে। কিছুদিন আগে একটি গাছের ডাল ভেঙে এক স্কুলশিক্ষিকা ও তাঁর মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দিন আগে আমার একটি ঘরও গাছের ডাল পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
মোটরসাইকেলচালক আব্দুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে খুব ভয় নিয়ে মোটরসাইকেল চালাতে হয়। কখন যে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে, আতঙ্কে থাকি। এই সড়কে গাছ পড়ে বা ডাল ভেঙে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো দ্রুত অপসারণ করা দরকার।’
গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের মৌলভীবাজার এলাকার বাসিন্দা রাকী বলেন, ‘গঙ্গাচড়া কলেজ মোড় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি পুরোনো গাছ রয়েছে। অনেক গাছই এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিন থেকে চার মাস আগে আমাদের বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি মেহগনিগাছ উপড়ে পড়ে এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।’
গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহাফুজার রহমান দুলু বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমার এলাকায় একটি গাছ উপড়ে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু হয়। পরে ইউএনওর নির্দেশে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটা হয়েছিল। এতে আমার প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কাটা গাছগুলো এখনো রাস্তার ধারে পড়ে আছে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘কয়েকটি দুর্ঘটনার পর আগের ইউএনওর সময়ে কিছু গাছ কাটা হয়েছিল। বিষয়টি আমি জেলা সমন্বয় সভায় বারবার তুলেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেহেতু গাছগুলো জেলা পরিষদের অধীন, তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এ বিষয়ে রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।