পালঙ্কে শুয়ে-বসেই দিন কাটান মৎস্যচাষি ইকবালুর বাসার। তিনি যে পালঙ্কে ঘুমান, সেটির মালিকানা ছিল পুঠিয়ার চারআনি রাজবংশের শেষ পুরুষ নরেশ নারায়ণ ও তাঁর স্ত্রী কমর বেগমের। রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির পাশেই ইলুর বাড়ি।
ইলুর দাবি, মামলা-মোকদ্দমায় দৈন্যদশায় পড়েছিলেন কমর বেগমের মেয়ে রেজিনা জামাল। তাই ১৯৯১ সালের দিকে তিনি এই পালঙ্ক বিক্রি করেন। তিন মাসের বেতনের টাকা জমিয়ে কমর বেগমের পালঙ্কটি কিনেছিলেন তাঁর স্কুলশিক্ষক বাবা আবদুর রহমান খান।
সম্প্রতি রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের একটি ভবন ভাঙার কাজ শুরু করেছেন মনিরুল ইসলাম সাবু নামের এক ব্যক্তি। ভবনটিতে একসময় রাজবাড়ির দারোয়ান নিতাই সিং বাস করতেন বলে জানান স্থানীয়রা। কিন্তু পুঠিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, এই বাড়িসহ ৫ শতক জায়গা তাঁর দাদা ইয়াকুব আলীর কেনা সম্পত্তি। তবে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলে ভাঙার কাজ আটকে দিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এ নিয়ে পুঠিয়া রাজবাড়ির কাস্টডিয়ান হাফিজুর রহমান গত মঙ্গলবার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই দোতলা বাড়ি ভাঙার সময় মালপত্র বের করা হয়। তখন পুরোনো নকশার একটি ড্রেসিং টেবিল বের করে শিবমন্দিরের পাশে রাখা হয়। দোতলার পরিত্যক্ত কক্ষে অযত্নে-অবহেলায় এত দিন ধরে পড়ে থাকা ড্রেসিং টেবিলটিও রাজবংশের বলে ধারণা স্থানীয়দের। এই ড্রেসিং টেবিল নিয়ে আলোচনার মধ্যেই খবর আসে কমর বেগমের পালঙ্কের।
বিষয়টি দেখতে গত মঙ্গলবার দুপুরে ইলুর বাড়ি যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন হাফিজুর রহমানও। ইলু স্বীকার করেন, পুরোনো নকশার এই পালঙ্ক কমর বেগমের। তবে তাঁর মেয়ে রেজিনা জামাল পালঙ্কটি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে গেছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, চারআনি রাজবংশের শেষ পুরুষ নরেশ নারায়ণ নাটোরের রাজা জিতেন্দ্র নাথের দ্বিতীয় কন্যা সুরেশ্বরীকে বিয়ে করেছিলেন। সুরেশ্বরী দেবীর কোনো ছেলে না থাকায় তাঁর সঙ্গে নরেশ নারায়ণের সুসম্পর্ক ছিল না। রাজা নরেশ নারায়ণ প্রায়ই কলকাতায় যেতেন। সেখানেই মুসলিম নারী কমর বেগমের সঙ্গে পরিচয়। মুসলমান হয়ে তাঁকে বিয়েও করেন নরেশ।
কথিত আছে, পরবর্তী সময়ে রানি সুরেশ্বরী বিষ পান করিয়ে রাজা নরেশ নারায়ণকে হত্যা করেন। খবর পেয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী কমর বেগম কলকাতা থেকে পুঠিয়ায় এসে রাজপরিবারের হাল ধরেন। পুঠিয়া কাছারিবাড়ির পাশে চারআনি রাজবাড়িতে দীর্ঘদিন তিনি বাস করেন। ১৯৮৭ সালে মারা যান তিনি।
ইকবালুর বাসার ইলু বলেন, ‘কমর বেগমকে আমিও দেখেছি। তাঁর মৃত্যুর পর জমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমায় অর্থকষ্টে পড়েছিলেন মেয়ে রেজিনা জামাল। তখন তিনি এই পালঙ্ক বিক্রি করেন। পরে এটা আমি শুধু রং করেছি। নিজেই ঘুমাই।’ পালঙ্কটি জাদুঘরে দেবেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শখ করে কিনেছি। এটা দিতে চাই না।’
এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলামের বাড়িতে অযত্নে পড়ে আছে ড্রেসিং টেবিল। মনিরুল জানিয়েছেন, এই ড্রেসিং টেবিল তিনি দাদার আমল থেকে দেখছেন। ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় দোতলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। মনিরুল ইসলামের দাবি, এটি রাজবাড়ির সম্পদ নয়। যে বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, সেটিও তাঁদের কেনা সম্পত্তি।
তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও গবেষকেরা বলছেন, এই ভবন পুঠিয়া রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের ভেতরে। ১৮২৩ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। এর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যও রয়েছে। রাজবাড়ির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ভবনটি নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
হাফিজুর রহমান বলেন, ‘পুঠিয়া রাজবাড়ি ঘিরে থাকা সব স্থাপনাই রাজবংশের ছিল। নানা কায়দায় অনেক সম্পদ স্থানীয় লোকজন নিজেদের নামে করে নিয়েছেন। রাজবংশের ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্রও বেহাত হয়ে গেছে। রাজবাড়ির আশপাশে থাকা কিছু প্রাচীন ভবনেও সেগুলো থাকতে পারে। ধীরে ধীরে দেখব। আমরা জিনিসপত্র সংগ্রহ করে রাজবাড়ির জাদুঘরে সংরক্ষণ করছি। এ জন্য জাদুঘরে দুটি গ্যালারিও বাড়িয়েছি।’
পালঙ্ক ও ড্রেসিং টেবিলের বিষয়ে জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ড্রেসিং টেবিলটি এখনো দেখিনি। গিয়ে দেখব। বেগমের পালঙ্কটি দেখে এসেছি। আমরা তো জোর করে কেড়ে নিতে পারি না। অনুরোধ করতে পারি, তাঁরা যেন জাদুঘরে দেন। দাতা হিসেবে তখন তাঁদের নামও থাকবে। আমরা সেভাবেই তাঁদের অনুরোধ করব।’