রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গণভোটবিষয়ক মতবিনিময় সভায় হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে ‘ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের’ নাম ঘোষণা করেছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সভায় আওয়ামীপন্থী শিক্ষক বক্তব্য দেওয়ায় এবং উপস্থিত থাকায় তিনি এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় আম্মার বলেন, অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য তো তখনই নষ্ট হয়েছে, যখন ফ্যাসিস্টগুলোকে সামনে বসিয়ে গণভোটের আলোচনা করা হচ্ছে।
আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের যৌথ আয়োজনে গণভোটবিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সিনেট ভবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৩টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে গণভোটবিষয়ক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
এতে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম মোল্ল্যা। তাঁর বক্তব্যের পরই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার।
পরে আম্মার কিছু কাগজ হাতে মঞ্চের সামনে এসে সঞ্চালনাকারী রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদের নিকট বক্তব্য দেওয়ার জন্য এক মিনিট সময় চেয়ে অনুরোধ জানান। তবে সঞ্চালক তাঁর অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। এরপর অনুষ্ঠানের সভাপতি রাবি উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের কাছে অনুরোধ করেন আম্মার। পরে উপাচার্য তাঁকে কথা বলতে সম্মতি দেন।
এরপর আম্মার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘এখানে এমনও মানুষ বসে আছে, যারা জুলাইয়ে নীরব ছিল। এখানে এমনও মানুষ বসে আছে, যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ন্যারেটিভ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে পুণ্ড্র ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আছে।’
পরে আম্মার তাঁর হাতে থাকা কাগজ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিরোধিতাকারী কয়েকজন শিক্ষকের নাম প্রকাশ করতে চান। এ সময় সঞ্চালক মঞ্চ থেকে তাঁকে নিষেধ করেন। তবে আম্মার না থেমে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তারসহ কয়েকজন শিক্ষকের নাম ঘোষণা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সঞ্চালক চেয়ার থেকে উঠে এসে আম্মারকে থামার জন্য অনুরোধ করে বলেন, ‘আম্মার, অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।’
পরে আম্মার প্রতিউত্তরে বলেন, ‘অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য তো তখনই নষ্ট হয়েছে, যখন ফ্যাসিস্টগুলাকে সামনে বসাইয়া গণভোটের আলোচনা করা হচ্ছে। এখানে ১৬১ জন শিক্ষকের নাম আছে। এটা আমাকে বলতে দিতে হবে। নাহলে জুলাই আহত ও শহীদ পরিবারের সবাইকে নিয়ে বের হয়ে যাইতে হবে।’
পরে উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীব চেয়ার ছেড়ে এসে আম্মারকে থামান এবং অনুষ্ঠান শেষে তাঁর কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য বলেন। উপাচার্যের আশ্বাসে অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নাম প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে সেখান থেকে চলে যান আম্মার।
সংবাদ সম্মেলনে ১৬১ শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে কর্মসূচির ঘোষণা করেন আম্মার।
মতবিনিময় সভা শেষে সেখানে আবারও উপস্থিত হন সালাহউদ্দিন আম্মার। ওই মঞ্চেই তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি ওই ১৬১ শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেন এবং জুলাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাঁদের বিভিন্ন ভূমিকার অভিযোগ তোলেন। এ ছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সভার বাইরে অবস্থান করবেন বলেও কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
আম্মারের তালিকায় থাকা শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল ইসলাম ও অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, কোষাধ্যক্ষ অবায়দুর রহমান প্রামাণিক, প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, আইসিটি সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক খাদেমুল ইসলাম মোল্ল্যা, শিক্ষক সমিতির বর্তমান সভাপতি হাবিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক সরকার প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আম্মার জুলাই আন্দোলনে অর্থায়ন, বয়ান তৈরি, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলায় মদদ দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন।
কর্মসূচি ঘোষণা করে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের একটি সভা রয়েছে। ওই সভায় এই ১৬১ জন শিক্ষকের বিচারের কোনো সিদ্ধান্ত না আসলে আমরা সভা শেষ হতে দেব না। সকল শিক্ষার্থীর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা আমার সঙ্গে সংহতি জানাবেন। শিক্ষার্থীরা না থাকলেও আমার একা দাঁড়িয়ে থাকতে হলেও আমি অবস্থান করব।’