রাজশাহীর চারঘাটে রামদার কোপে এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীর দুটি আঙুল বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন স্থানীয় এক যুবদল নেতা। এই ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। সাংবাদিকের কাছেও তিনি স্বীকার করছেন এই ঘটনার কথা। এরপরও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাজিদুল ইসলাম মিন্টু (৪৩) নামের এই যুবদল নেতা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মিন্টুর দাপটের কাছে সবাই অসহায়। আর পুলিশ বলছে, তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর নাম আল-আমিন আলী (৩২)। তিনি চারঘাট পৌরসভার পূর্ব আস্করপুর মহল্লার বাসিন্দা। সরদহ বাজারে মেসার্স আল-আমিন সাইকেল স্টোর অ্যান্ড হার্ডওয়্যার নামে তাঁর একটি দোকান রয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল দোকানে প্রথম দফা তাঁর ওপর হামলা হয়। এরপর চিকিৎসা নিতে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে যুবদল নেতা মিন্টু তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে দুটি আঙুল বিচ্ছিন্ন করে দেন। এই ঘটনায় আটজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন আল-আমিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চারঘাটের আস্করপুরে আল-আমিনের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, দুই হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন আল-আমিন। ব্যথায় ছটফট করছেন।
আল-আমিনের ভাই ইসাহাক আলী বলেন, ‘রামদার কোপে আল-আমিনের বাঁ হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বৃদ্ধাঙ্গুলের বেশির ভাগ অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ঝুলছিল। বাঁ হাতের কনুইয়ে রয়েছে ১২টি সেলাই। আর ডান হাতের কনুইয়ে ৬টি সেলাই। ডান পায়ের হাঁটুতেও রামদার কোপ রয়েছে। পিঠের ৫টি স্থানে আছে আরও ১৫টি সেলাই। বাঁ পায়ের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ক্ষত।’
আল-আমিনের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলায় যুবদল নেতা মিন্টুকে আসামি করা হয়েছে। চারঘাট উপজেলা যুবদলের এখন কমিটি নেই। সরদহ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তিনি ছাড়াও মামলায় তাঁর বোন নাজমিন আরা মায়া (৪৫), দুই ভাগনে নাফিউল ইসলাম ওরফে মেগাবাইট (১৯) ও জুলকার নাঈম ওরফে মনিটরকে (২৪) আসামি করা হয়েছে। অন্য তিন আসামি হলেন মো. দেওয়ান (২৬), শাহিন আলম বোল্টে সুজাউদ্দৌল্লা (৩৬), মো. সুরুজ (২৯) এবং মো. আপেল (২৩)। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ঘটনার পর মায়া ও বোল্টেকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু আদালতে তোলা হতেই তাঁরা জামিন পেয়ে গেছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। মিন্টু এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মামলার এজাহার, ভুক্তভোগী পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৬ এপ্রিল দুপুরে যুবদল নেতা মিন্টুর ভাগনে মেগাবাইট একটি জিআই পাইপ নিতে আল-আমিনের দোকানে যান। আল-আমিন তখন খাচ্ছিলেন। তাই তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেন। তখন মেগাবাইট পাইপ নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করলে আল-আমিন বলেন, বেশি তাড়া থাকলে অন্য দোকান থেকে নিয়ে নিতে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেগাবাইট দোকানের জিআই পাইপ দিয়ে আল-আমিনের মাথায় আঘাত করেন। তখন আল-আমিনও তাঁকে মারধর করেন।
পরে মাথা ফাটা অবস্থায় আল-আমিনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান তাঁর ভাই ইসাহাক। তখন যুবদল নেতা মিন্টু দলবল নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। তাঁরা জরুরি বিভাগের বেড থেকে নামিয়ে আল-আমিনকে মারধর করেন এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কোপান। তাঁরা চলে যাওয়ার পর আল-আমিনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাতেই তাঁকে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে আল-আমিন বাড়িতে আছেন। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তিনি।
আল-আমিন বললেন, তাঁরা জামায়াতের সমর্থক। আর মিন্টুর দুই ভাগনে আগে ছাত্রলীগ করতেন। আওয়ামী লীগের আমলে তাঁরা মাঝেমধ্যে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা নিতেন। ৫ আগস্ট থেকে নির্বাচনের সময় পর্যন্ত তাঁদের উৎপাত একটু বন্ধ ছিল। নির্বাচনের পর তাঁরা আবার চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। তাঁর কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি চাঁদা দেননি। এ জন্য আগে থেকে তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তাঁরা।
আল-আমিন বলেন, ‘এখনো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আসামিরা মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় বাড়িতে হামলা হতে পারে।’
ইসাহাক আলী বলেন, ‘মিন্টুর দাপটে তাঁর বোন মায়া সরদহ বাজারে এক ব্যক্তির একটি দোতলা বাড়ি দখল করে রেখেছেন। সেই বাড়িতেই মিন্টু ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর টর্চার সেল করা হয়েছে। সেখানে দেশীয় অস্ত্র মজুত করা আছে। বিচার-সালিসের নামে লোকজনকে ডেকে নির্যাতন করা হয়। মিন্টুর নাম শুনলে সবাই ভয় পায়; অথচ পুলিশ তাঁকে ধরছে না।’
চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক বলেন, ‘দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আত্মগোপনে থাকায় অন্যদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
পুলিশ আসামিদের আত্মগোপনে থাকার কথা বললেও যুবদল নেতা মিন্টুর মোবাইল খোলা। শুক্রবার সকালে মোবাইলে যোগাযোগ করে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘আল-আমিন আমার ভাগনেকে মেরেছিল। তাই হাসপাতালে তাঁকে মারতে গিয়ে রামদার আঘাতে দুটি আঙুল পড়ে গেছে। এটা নিয়ে সবাই মিলে এত ফোন করলে হয়!’