মাত্র ৫৩ দিন আগে মায়ের কোলজুড়ে এসেছিল ছোট্ট অদ্রিজা মণ্ডল। পৃথিবীর আলো দেখার পর মায়ের আদর আর ভালোবাসা যখন তাকে ঘিরে রাখার কথা, ঠিক সে সময়ই মা হারিয়ে গেল দূর অজানায়। যে মা তাকে পৃথিবীতে আনতে অস্ত্রোপচারের টেবিলে গিয়েছিলেন, সেই মা-ই আজ নেই।
কণিকা মণ্ডল (৩৫) আর ফিরবেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী কণিকা ছিলেন তিন সন্তানের মা। গত ২৯ জুন ফরিদপুরের শমরিতা হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে অদ্রিজার জন্ম হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের পর কণিকার পেটে প্রায় দেড় কেজি গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৩ জুলাই তাঁকে ঢাকার কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ জুলাই অস্ত্রোপচার করে তাঁর পেট থেকে গজ বের করা হয়।
তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকেও অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। অবশেষে গতকাল থেমে যায় কণিকার জীবনযুদ্ধ।
কণিকার মৃত্যুতে অশান্ত মণ্ডল শুধু যে তাঁর স্ত্রীকে হারিয়েছেন, তা নয়। তিন সন্তানও হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বড় ছেলে পার্থ মণ্ডল নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মেজো ছেলে অঙ্কন মণ্ডল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তারা দুজনই মাকে দেখেছে, মায়ের স্নেহ-শাসনে বড় হয়েছে। কিন্তু এখন থেকে তাদের প্রতিটি দিন কাটবে মায়ের শূন্যতা নিয়ে। আর মাত্র ৫৩ দিনের অদ্রিজা জানেই না, যে মানুষটির বুকের উষ্ণতায় তার ঘুমিয়ে পড়ার কথা, সেই মা আর কোনো দিন তাকে কোলে নেবেন না।
স্ত্রী হারানোর শোকের সঙ্গে তিন সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন অশান্ত মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘আমি এখন দুই মাসের সন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচব? এই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েগুলো নিয়ে অথই সাগরে পড়ে গেলাম। আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, জানি না। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বাবার এই অসহায় কথার ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের পুরো গল্প। একদিকে স্ত্রীর শূন্যতা, অন্যদিকে তিন সন্তানকে একা সামলানোর দায়িত্ব। পার্থ ও অঙ্কনের পড়াশোনা, অদ্রিজার বেড়ে ওঠা—সবকিছুই এখন অশান্ত মণ্ডলের একার কাঁধে।
যে ঘরে কয়েক দিন আগেও কণিকার কণ্ঠে সন্তানদের ডাক শোনা যেত, সেখানে এখন ছড়িয়ে আছে কেবল তাঁর স্মৃতি। রান্নাঘর, সন্তানের পড়ার টেবিল, ছোট্ট অদ্রিজার বিছানা—সবকিছুতেই যেন মায়ের ছোঁয়া রয়ে গেছে। শুধু নেই সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন সন্তানদের ঘিরেই নিজের পৃথিবী সাজিয়েছিলেন।
অদ্রিজা হয়তো একদিন বড় হবে। কথা বলতে শিখবে, হাঁটতে শিখবে, মাকে নিয়ে প্রশ্ন করবে। হয়তো একদিন জানতে চাইবে, ‘আমার মা কোথায়?’ তখন তাকে বলতে হবে—পৃথিবীতে আসার মাত্র ৫৩ দিনের মাথায় তুমি তোমার মাকে হারিয়েছিলে। সে হয়তো কথাটা বুঝবে, কিন্তু মায়ের আদর কাকে বলে, সেই অনুভূতিটা আর কোনো দিন জানার সুযোগ পাবে না।
কণিকার মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি পরিবারটির হাতে ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা তুলে দেন। এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন ও বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও দায় বা চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।