হোম > সারা দেশ > পাবনা

এক বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের পর ১০ প্রসূতির যক্ষ্মা শনাক্ত, তদন্তে কমিটি

­­শাহীন রহমান, পাবনা

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতাল। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর ১১ জন রোগী যক্ষ্মায় আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, একই হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর তাঁদের ক্ষতস্থানে জটিলতা দেখা দেয়। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের পাশাপাশি বেসরকারি ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছে ভুক্তভোগীরা।

এদিকে এ ঘটনা তদন্তে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) ফরিদপুর উপজেলা সদরের থানাপাড়া গিয়ে দেখা যায়, কবরস্থান সংলগ্ন জরাজীর্ণ একটি বাড়ি। ওই বাড়িতে বসবাস গোলাম রাব্বি-আয়েশা দম্পতির। বাড়িতে গিয়ে গোলাম তাঁদের পাওয়া যায়নি। পরিবারের অন্য সদস্যরা জানান, গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আয়েশা।

কথা হয় গোলাম রাব্বির বাবা ভ্যানচালক মোহন আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, পুত্রবধূ আয়েশার সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারীনগর বাজার সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে অবস্থিত আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করান। গত ৩১ মে আয়েশা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।

সন্তান জন্মের পর পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যায়। নাতিকে নিয়ে হেসে খেলে দিন কাটাবেন— এমন আশায় ছিলেন মোহন। সেই আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়, যখন সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষতস্থান দীর্ঘ দিনেও না শুকানোয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। একপর্যায়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। বর্তমানে আয়েশার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার।

শুধু আয়েশা নয়, তাঁর মতো একই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানো আরও ১০ জন রোগীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। মোট ১১ জনের মধ্যে ১০ জন সিজারিয়ান এবং একজন গলব্লাডার অপারেশনের পর যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে।

কথা হয় থানা পাড়া এলাকার জয়া রাণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সন্তান হওয়ার পর ভেবেছিলাম সন্তানকে নিয়ে হেসে খেলে দিন কাটাব। কিন্তু নতুন অসুখ শরীরে বাসা বাঁধল! দরিদ্র পিতা-মাতার পক্ষে চিকিৎসার ব্যয়ভার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। একই কথা ফরিদপুর উপজেলা সদরের গোপালনগর এলাকার মিতা খাতুনের। তিনি বলেন, স্বামী দিনমজুর। চলতি বছরের ২ মে আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। অপারেশনের পর ক্ষতস্থান না শুকানোয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। একপর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, ‘আসলে কোন রোগীর থেকে এই জীবাণু ছড়িয়েছে সেটি আমরা বুঝতে পারছি না। তবে প্রায় চার মাস আগে আমাদের হাসপাতালে ৭৫ বছর বয়সী এক রোগীর হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তাঁর অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন দেখা দিলে পরীক্ষা করে তাঁর যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে সেই রোগীর থেকে এই জীবাণু ছড়িয়েছে।’

নিজেদের ভুল স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর অপারেশন থিয়েটার নতুন করে জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে।’

ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল হাসান শাওন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বেসরকারি হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তারা জবাব দিয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যবস্থা নেবে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এ কর্মকর্তা আরও জানান, গতকাল সোমবার এ ঘটনায় ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আশিকুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।