আত্মহত্যার আগে ভিডিও বার্তায় মেঘনা
‘আমি যদি দুনিয়ায় না থাকি, আমার কবরের কাছে একটু যাইও তুমি। আমার একা থাকতে ভয় করে। একটু যাইও তুমি। তোমাকে অনেক ভালোবেসে বাপ-মা ছেড়ে আইছিলাম, আমি আর মানসিক যন্ত্রণা নিতে পারছি না।’ স্বামীর উদ্দেশে এমন আবেগঘন ভিডিও বার্তা রেখে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন মেঘনা খাতুন (২১) নামের এক গৃহবধূ। মৃত্যুর আগে ধারণ করা ওই ভিডিও বার্তায় স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়া আর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি। আবেগঘন সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল সোমবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মেঘনা খাতুনের। তাঁর আগের দিন রোববার নিজ ঘরে আত্মহত্যা করতে গলায় ফাঁস নেন তিনি।
মেঘনা খাতুন পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের চরগড়গড়ি গ্রামের শফি মণ্ডলের ছেলে আজম আলী মণ্ডলের স্ত্রী। মেঘনা খাতুনের বাবার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তাঁদের একটি পুত্রসন্তানও রয়েছে। স্বামী পেশায় মোটর মেকানিক। আজম আলীর সঙ্গে চার বছর আগে প্রেমের সম্পর্কে বিয়ে হয়েছিল মেঘনা খাতুনের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর ওই দম্পতির দিন ভালোই চলছিল। এরপর হঠাৎ পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। বেশ কিছুদিন ধরেই মেঘনা খাতুন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে একটি ভিডিওতে তিনি নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন।
ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে মেঘনা বলেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য স্বামী আজম, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং আসলাম নামের এক ব্যক্তি দায়ী। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো এবং স্বামী তাঁর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। ভিডিওতে মেঘনা খাতুন বলেন, ‘স্বামী আমাকে রেখে পরকীয়া করে বেড়ায়। আমি কিসে কম আছি? আমাকে বুকে নেয় না। ভালোবাসে না।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আজম আমার গলায় টিপ মেরেছে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়েছে।’
ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেঘনা আরও বলেন, হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার পরও তাঁর ওপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি। নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাঁর ছেলে যেন বাবার পরিবারেই থাকে এবং মাঝে মধ্যে নানির বাড়িতে যেতে পারে।
সব শেষে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে মেঘনা খাতুন বলেন, ‘আমি যদি দুনিয়ায় না থাকি, আমার কবরের কাছে একটু যাইও। আমি অনেক ভালোবাসি। প্রেম করে বিয়ে করেছি, বাবা-মা সবাইকে ছেড়ে এসেছি। আমি আর মানসিক টেনশন নিতে পারছি না। আমার মোবাইল ফ্রিজের মাথার ওপর রাউটারের বক্সের ভিতর রেখে যাবোনে। আমার মোবাইলের লক ৩৩১৬। খুলে সবাই দেইখো।’
ঘটনার পর থেকে মেঘনা খাতুনের স্বামী অভিযুক্ত আজম আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুর রহমান বলেন, ‘ভুক্তভোগী মারা গেছেন রাজশাহীতে। সেখানে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। আর আমরা সাধারণ ডায়েরিতে নোট করে রাখছি।’
ওসি আরও বলেন, ‘মেঘনার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে মামলা করতে বলেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁরা এজাহার দেয়নি। পরিবার থেকে অভিযোগ না দিলে আসলে আমাদের কিছু করার নেই।’