হোম > সারা দেশ > নীলফামারী

৭ দিনের আগ্রাসনে তিস্তায় বিলীন ২০০ ভিটা

মাসুদ পারভেজ রুবেল  ডিমলা (নীলফামারী) 

তিস্তার নির্মম গ্রাসের আগে শেষ চেষ্টা—ভিটেমাটির আশা ছেড়ে টিন, কাঠ আর স্মৃতিগুলো নৌকায় তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের পথে মানুষ। গতকাল নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিস্তার ভাঙন যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ৯০ ছুঁই ছুঁই তফেল উদ্দিনের। অন্তত ১৫ বার ঘরবাড়ি হারিয়েও বারবার নতুন করে আশ্রয় গড়েছেন। কিন্তু শেষ বয়সেও আর রক্ষা হয়নি। গত শুক্রবার দুপুরে তাঁর চোখের সামনেই তিস্তা গিলে নিয়েছে শেষ সম্বল, শেষ আশ্রয়টুকু।

যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল বসতভিটা, সেখানে এখন বয়ে চলেছে ঘোলা জলের তীব্র স্রোত। ভিটার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তফেল উদ্দিন বলেন, ‘১৩ বার ভিটাবাড়ী নদী ভাঙিল, ৬০ বিঘা আবাদি জমিও তিস্তাত গ্যাল। ৮ শতক জমি কিনি ৬টা ছাওয়াক নিয়্যা সংসার তুলি এটে ছিনু, শেষ বয়সেও তিস্তা মুক্তি দিল না। এখন নদীত ঝাঁপ দিয়া মরা ছাড়া হামার উপায় নাই।’

তফেল উদ্দিনের বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া গ্রামে। ২০১৬ সালে তিস্তার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে বসতি গড়েছিল পাঁচ শতাধিক পরিবার। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে তফেলের মতো এই গ্রামের দুই শতাধিক বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। শতাধিক বাড়ি ও ফসলি জমি এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে।

পরিবার নিয়ে কোনটে দাঁড়ামু

সরজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিশাল অংশ প্রতিনিয়ত ধসে পড়ছে। শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি করে ঘরবাড়ি ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ নৌকায় আসবাব ও গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে। ভিটামাটি হারিয়ে অনেক পরিবার গৃহস্থালির মালপত্র নিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

২০১৬ সালে ধারদেনা করে ছয় শতক জমি কিনে ভিটা বেঁধেছিলেন জামাল হোসেন। চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। আজ সেই ভিটার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নদীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাত তুলে জামাল হোসেন বলেন, ‘ওইটা মোর ভিটা ছিল, সব শেষ হয়া গেল! এই তিস্তাই হামার জীবনটা শেষ করি দিল। শেষ বয়সে আইসা পরিবার নিয়ে কোনটে দাঁড়ামু, তার কোনো পথ নাই!’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি কমার কারণে নদীতীরে স্রোতের টান বেড়েছে। ফলে ভাঙন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।

ধসের মুখে ২ কোটি টাকার মুজিব কিল্লা

চরাঞ্চলবাসীর দুর্যোগকালীন আশ্রয়ের সুবিধার্থে ২০২৩ সালে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেল্লাপাড়ায় নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ‘মুজিব কিল্লা’ (বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র)। তবে অপরিকল্পিতভাবে নদীতীরের একেবারে কাছে এটি নির্মাণ করায় ভবনটি এখন ধসের মুখে। নদীতীর থেকে মাত্র ৮০-৯০ মিটার দূরে অবস্থান করায় যেকোনো মুহূর্তে কিল্লাটি তিস্তায় তলিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘নদীর একবারে মুখের ওপর কিল্লা বানাইছে, কিন্তু বাঁধ না দিলে তো সেটা টিকবে না। এ্যালা নদী ভাঙতে ভাঙতে কিল্লার কাছে আসি গেছে। যেকোনো সমায় কিল্লাটা নদীত ধসি পড়বে।’

ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘নদীর ভাঙতে ভাঙতে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের কাছে চলে এসেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহর্তে আশ্রয়কেন্দ্রটি বিলীন হয়ে যাবে।’

পাশে নেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্ষোভ দুর্ভোগের এই চরম মুহূর্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা পাউবোর কোনো কর্মকর্তা না আসায় নদীপারের মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপদের সময় কাউকেই পাওয়া যায় না। নদী যখন সব কেড়ে নেয়, তখন নামমাত্র দু-এক বস্তা জিও ব্যাগ ফেলে পাউবো লোকদেখানো দায়িত্ব শেষ করে। ভোট এলে প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও এখন তাঁদের খোঁজ নিচ্ছেন না কেউ।

ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘পানি কমার সময় নদীতে ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়, যার কারণে নদীতীর দ্রুত ধসে পড়ছে। ছাতুনামা কেল্লাপাড়া এলাকার ভাঙন পরিস্থিতির খবর আমরা পেয়েছি। ভাঙনরোধ এবং আশ্রয়কেন্দ্রটি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে সরকারি ত্রাণসহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

গোপনে নিয়োগ, অর্থ লেনদেনের কথা স্বীকার করলেন স্কুল কমিটির সভাপতি

ডিমলায় ভাড়া বাসায় ইয়াবার ব্যবসা, দম্পতিসহ আটক ৩

তিন বছরেও চালু হয়নি ২১ কোটি টাকার মার্কেট

ডিমলায় সেতুর নিচের পানির প্রবাহ বন্ধ করে বাড়ি নির্মাণ, জলাবদ্ধতা

নীলফামারীতে বিয়ের পর কনে নিয়ে ফেরার পথে মাইক্রোবাস খাদে, শিশুসহ নিহত ২

বিয়ের পরদিন মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, শোকে মামার মৃত্যু

ডিমলায় বড় বোনের সঙ্গে নদীতে গোসলে নেমে শিশুর মৃত্যু

দ্রুত বাড়ছে তিস্তার পানি, দুই জেলায় বন্যার শঙ্কা

ধাইজান নদীকে ‘খাল’ দেখিয়ে খনন: ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

সৈয়দপুর রেলওয়ে: নষ্ট হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ