হোম > সারা দেশ > নাটোর

সবুজ চাদরে বিবর্ণ চলনবিল, কচুরিপানায় ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন

আনিসুর রহমান, গুরুদাসপুর, নাটোর

যেখানে থইথই পানির ঢেউ থাকার কথা, সেখানে দখল-দূষণে ভরাট চলনবিল। চারদিকে কচুরিপানার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে বিলের চিরচেনা রূপ। ছবি: আজকের পত্রিকা

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে চলনবিল। একই রকম সংকটে রয়েছে চলনবিলকেন্দ্রিক নদ-নদীগুলোও। পানির অভাবে বর্ষাতেও এখন প্রাণহীন চলনবিল। শরতে এসে জেগে উঠেছে চলনবিল। কমছে নদীর পানি। এমন পরিস্থিতিতে চলনবিলজুড়ে আটকে আছে কচুরিপানার দল। ফলে একদিকে মৎস্যসম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি আবাদ। কিন্তু এ সংকট নিরসনে বাস্তবভিত্তিক কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে চলনবিলজুড়ে কচুরিপানার দল আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে আমনসহ সরিষা, গম ও ইরি-বোরো ধানের আবাদ বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রও হুমকির মুখে পড়েছে।

চলনবিলের মাঝে কফি হাউসে যাতায়াতের জন্য বাঁশের সেতু। ছবি: আজকের পত্রিকা

মৎস্য ও কৃষি বিভাগের ভাষ্যমতে, চলনবিলের মাঝ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং যথেচ্ছভাবে পুকুর খননের কারণে চলনবিল আগের অবস্থায় নেই। অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষার পানির গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী নদী ও নালাগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার হয় না। দখল-দূষণে ভরাট হয়ে পড়েছে এসব নদী-নালা। বর্ষায় পানির প্রবাহ থাকলেও অবৈধ সোঁতিজাল ও খরাজালে মাছ ধরার প্রবণতা বাড়ায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে উজান থেকে নেমে আসা কচুরিপানার দলগুলো ভাটিতে যেতে পারে না। নদী ও চলনবিলেই আটকে থাকে। এতে নৌ চলাচল ও পর্যটন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কচুরিপানার উৎস

কচুরিপানার উৎস পাশের দেশ। কারণ, বর্ষা শুরু হলেই উত্তরের ঢলগড়া পানির সঙ্গে পদ্মা ও আত্রাই নদ হয়ে দলে দলে কচুরিপানার দল ছড়িয়ে পড়ে ভাটির নদ-নদী ও চলনবিলে। তা ছাড়া নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলা থেকেও আসে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ভেসে আসা কচুরিপানা ভাটির দিকে যেতে না পেরে আটকে থাকছে নদ-নদী ও চলনবিলে।

চলনবিল কী

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলনবিলের কথা’ বইয়ের লেখক এম হামিদের বর্ণনা ধরে এখন চলনবিলে গেলে হতাশ হতে হয়। দখল-দূষণে দেশের বৃহত্তম চলনবিলের নদ-নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে বিলের বিভিন্ন খাল। ভূ-উপরিস্থ পানি না থাকায় নেমে গেছে পানির স্তর। ফলে বিলুপ্ত হতে বসেছে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি আবাদ।

পূর্ব ইতিহাস বলে, রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা ও ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিল চলনবিল। বর্তমানে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ—এই তিন জেলার ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বৃহত্তর চলনবিল। বিলে রয়েছে ২১টি নদ-নদী, ৭১টি নালা-খাল ও ৯৩টি ছোট বিল।

চলনবিলের গুরুদাসপুর-তাড়াশ ডুবো সড়ক। বর্ষায় পানিতে ডুবে যায় সড়কের বড় অংশ। ছবি: আজকের পত্রিকা

কমছে বিলের আয়তন

‘ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’র মতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এই আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। হিসাব অনুযায়ী, ৮৩ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ৪০৮ বর্গমাইল। উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ার মতে, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। এই হিসাবে ১৯০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ১৯৯ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছর গড়ে বিলের আয়তন কমছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

শরতের মেঘলা আকাশ। চলনবিলের বুকে এমন মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে। ছবি: আজকের পত্রিকা

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির তথ্যমতে, ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইন প্রথমবার চলনবিলকে দ্বিখণ্ডিত করে। ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের ৫৫ কিলোমিটার এবং ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ী-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এর পর থেকে চলনবিলে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে।

ভরাট হচ্ছে নদ-নদী, খাল

চলনবিলের পানিপ্রবাহের প্রধান উৎস হচ্ছে বড়াল নদ, গুমানী ও আত্রাই। পদ্মা-যমুনার পানি এ তিন নদ-নদীর মাধ্যমেই বিলে প্রবেশ করে। ১৯৬১ সালে ফারাক্কার বাঁধের কারণে প্রথম এই পানি কমতে থাকে। ১৯৮৫ সালে বড়াল নদের উৎস মুখে রাজশাহীর চারঘাটে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বড়াল নদ পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এ সময় থেকে চলনবিল পানিশূন্য হতে শুরু করে।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে বড়াল নদ মরা খালে পরিণত হয়েছে। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। প্রায় ৬৬ হাজার ২৪০ জন কৃষক এসব খাল ও নালা থেকে সেচের পানি পেতেন। বর্তমানে ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, যা মোট নালা ও খালের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাকি ৪২ কিলোমিটার নালা ও খাল পুনরায় খনন করে নাব্যতা ফেরানোর কাজ চলছে।

বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাত হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, বিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষায় নদ-নদী, নালা ও খালে ৮ থেকে ১৬ ফুট পর্যন্ত পলি জমে। এতে প্রতি ১০ বছর অন্তর গড়ে ১২ ফুট পর্যন্ত নালা-খাল ভরাট হচ্ছে। এতে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। একদিকে মৎস্যসম্পদ বিলুপ্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সেচের পানি না পেয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কমছে মৎস্যসম্পদ

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, চলনবিলে ১৯৮২ সালে মাছের উৎপাদন ছিল ২৬ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন। এরপর ১৯৮৭ সালে ২৪ হাজার ৩৩৬ টন, ১৯৯২ সালে ১৮ হাজার ৭০০, ১৯৯৭ সালে ১৫ হাজার ৪২১, ২০০২ সালে ১২ হাজার ৪৬০ টন এবং ২০০৬ সালে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ১১৭ টন। এই হিসাবে ২৫ বছরে চলনবিলে মাছের উৎপাদন কমেছে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। গড় উৎপাদন কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবছর উৎপাদন কমেছে ৩ শতাংশ।

মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কৃত্রিমভাবে খননকৃত পুকুরে চাষ করা মাছের উৎপাদন বাড়ছে। বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে অনেকেই বিলে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। এতে প্রাকৃতিক মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী বলেন, বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, সংযুক্ত নালা ও খাল ভরাট, অপরিকল্পিত কাঠামো নির্মাণ, চাষ করা মাছের উৎপাদন ও জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণেই প্রাকৃতিক মাছ কমছে। প্রাকৃতিক মাছ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই বিলের নালাগুলো পুনরায় খননসহ বিরূপ কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

সরেজমিন চলনবিল ঘুরে দেখা গেছে, নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা এলাকার বিস্তীর্ণ চলনবিলজুড়ে কচুরিপানায় ভরে গেছে। এ কারণে পানির অস্তিত্ব বোঝা দায়। ফলে চলনবিলের স্বাভাবিক অবস্থা উপভোগ করা যাচ্ছে না। এতে নৌ চলাচল ও পর্যটন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় কৃষক রবিশস্য আবাদ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

বিলপাড়ের কৃষক ফারুক হোসেন, ময়েজ উদ্দিন ও হাসান আলী জানান, কচুরিপানার দাপটে রবিশস্য আবাদ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা। কারণ, কচুরিপানার কারণে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় সময়মতো পানি নামতে পারবে না। এ কারণে ছিটিয়ে বোনা সরিষা, গম এবং ইরি-বোরো ধান বিলম্বিত হবে। তা ছাড়া কচুরিপানা অপসারণ করতে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা করে বাড়তি খরচ হবে। এ জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।

নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

এখন চলনবিলে পানি থাকলেও মার্চ ও এপ্রিল মাসের চিত্র থাকে ভয়াবহ। কারণ, তখন চলনবিলে পানি থাকে না। চলে ইরি-বোরো ধানের আবাদ। নদ-নদীতেও পানি থাকে না। কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা থাকে। পানির জন্য হাহাকার কৃষকের। মাঠের পর মাঠ আবাদ, বোরো সেচের পানি সংকট। পানি পেতে ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে বসানো হয় সেচযন্ত্র। তবু পানি মেলে না।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, চলনবিল রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিকল্পনা, ভূমি, কৃষি, পানি সম্পদ, নৌ, স্থানীয় সরকার, মৎস্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সঠিক পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ-কালভার্ট ও স্লুইসগেট অপসারণ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে অপরিকল্পিত পুকুর খনন। তবেই চলনবিলে প্রাণ ফিরে পাবে।

পাখির চোখে চলনবিল। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশা এলাকা। ছবি: আজকের পত্রিকা

গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান নাজলি পারভিন বলেন, ‘চলনবিল এলাকার তিনটি আবহাওয়া কেন্দ্রের ১০০ বছরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বিলের আবহাওয়া প্রতিবছর বিরূপভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতিকূলতার কারণে আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবছর গড় বৃষ্টিপাত কমছে, বাড়ছে তাপমাত্রা। এতে একদিকে পানিতে অক্সিজেন কমে মাছের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।’

নাজলি পারভিন আরও জানান, চলনবিল বাঁচাতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে প্রকৃতির উপযোগী রাস্তা ও সেতু করতে হবে। তবেই জলজ উদ্ভিদের চক্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক হবে। জলজ প্রাণীর উৎপাদন স্বাভাবিক হবে। অন্যদিকে খাল খননের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক করতে পারলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও স্বাভাবিক হবে। চলনবিল প্রাণ ফিরে পাবে।