হোম > সারা দেশ > নরসিংদী

৫৫ বছর পরও অযত্নে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি

হারুনূর রশিদ, নরসিংদী প্রতিনিধি

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ। ছবি: সংগৃহীত

আজ ২০ আগস্ট বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের শৈশব কেটেছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরনগর (সাবেক রামনগর) গ্রামে। দিবসটি উপলক্ষে নরসিংদীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করবে।

তবে তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে নির্মিত স্থাপনাগুলোর অবস্থা হতাশাজনক। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাহমুদাবাদ এলাকায় নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মোরাল। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০৮ সালে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে তাঁর পৈতৃক বাড়িও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে স্মৃতি জাদুঘর এলাকায় মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এতে মুক্তিযুদ্ধের এই বীরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বীরত্বগাথা স্মরণে সাবেক রামনগর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরনগর’। তবে নামের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে থাকলেও তা সংরক্ষণে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, রামনগর হাইস্কুলের গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই সুবিশাল মাঠ। মাঠের পূর্ব পাশে ফুল, ফলদ ও বনজ গাছ রয়েছে। তবে প্রবেশপথের দেয়াল ও বসার স্থানগুলোর কিছু অংশ ভাঙা। গ্রন্থাগারের ভেতরে চেয়ার-টেবিল ও তাকভর্তি বই থাকলেও পাঠকের উপস্থিতি কম। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীরাই মূলত সেখানে বই পড়তে আসে।

সবচেয়ে হতাশাজনক অবস্থা স্মৃতি জাদুঘরের। জাদুঘর থাকলেও সেখানে বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত সামগ্রী, ঐতিহাসিক দলিল, দুর্লভ ছবি কিংবা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উল্লেখযোগ্য কোনো স্থায়ী প্রদর্শনী নেই। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা কাঙ্ক্ষিত তথ্য ও স্মৃতিচিহ্ন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরনগর গ্রামের রামনগর হাইস্কুলসংলগ্ন এলাকায় ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’। প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও বীরশ্রেষ্ঠের জীবন, সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

স্থানীয় কয়েকজন যুবক অভিযোগ করেন, দিনের বেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকলেও রাতে জাদুঘর এলাকায় নেশাগ্রস্তদের আড্ডা বসে। সেখানে মাদক সেবনের ঘটনাও ঘটে। রাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, গ্রন্থাগারটি স্কুলের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে হওয়ায় স্কুল চলাকালে সাধারণ দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে সংকোচ বোধ করেন। আলাদা প্রবেশদ্বার থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ত।

এদিকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের পৈতৃক বাড়িটিও দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে আছে। স্থানীয়রা জানান, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় বসবাস করেন এবং বছরে এক-দুবার বাড়িটি দেখতে আসেন। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় পাঠক ইমরান বলেন, ‘মাঝেমধ্যে এখানে বই পড়তে আসি। আমাদের গ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মত্যাগ আমাদের গর্বের। কিন্তু জাদুঘরে তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্ন না থাকায় হতাশ লাগে। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বই না থাকায় পাঠকের আগ্রহও কমে যাচ্ছে।’

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরনগর গ্রামে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। ছবি: আজকের পত্রিকা

সাবেক ইউপি সদস্য মামুন বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠের গ্রাম হিসেবে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, এখন পর্যন্ত তার ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায়নি। রাস্তাঘাটসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন প্রয়োজন।’

গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান বিউটি আক্তার জানান, গ্রন্থাগারে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ২০০ বই রয়েছে। তবে ২০০৮ সালের পর নতুন কোনো বই যুক্ত হয়নি। পাঠকদের জন্য নিয়মিত তিনটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকা রাখা হতো, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেগুলোও বন্ধ। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন পাঠক আসেন।

বিউটি আক্তার বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিসপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রদর্শনীর ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা জাদুঘরে কোনো প্রদর্শনী না থাকায় হতাশ হন।’

তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে জাদুঘরের ভেতরে পানি জমে ক্ষয়ক্ষতি হয়। অধিকাংশ বৈদ্যুতিক বাতি নষ্ট। নিজস্ব প্রবেশদ্বার না থাকায় দর্শনার্থীদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এসব সমস্যা উল্লেখ করে জেলা পরিষদে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের অসীম সাহসিকতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে গৌরবান্বিত করেছে। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত নতুন বই এবং স্মৃতি জাদুঘরে তাঁর ব্যবহার্য সামগ্রী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা জরুরি।’

তিনি রামনগর হাইস্কুলকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের নামে কলেজে উন্নীত করা, ইউনিয়নের নামকরণ এবং নরসিংদী জেলা স্টেডিয়ামের নাম তাঁর নামে করার দাবি জানান।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি তাঁর জন্মভূমিতেই স্থাপিত এবং জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।’