হোম > সারা দেশ > নরসিংদী

নরসিংদী পৌরসভা আছে, কিন্তু পৌরসভার নেই ‘বাপ-মা’

মো. সাইদুল ইসলাম, নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদী জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে, আর নরসিংদী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

নরসিংদী জেলা ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও নরসিংদী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। নরসিংদী জেলার সুনাম বহু আগে থেকেই। মেঘনার কোলঘেঁষে নরসিংদী পৌরসভা গঠিত। এক সময় পাটশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল নরসিংদী জেলা। বর্তমানে বিখ্যাত তাঁতশিল্পের জন্য। কিন্তু এত আগে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে নরসিংদী পৌরসভার বেহাল অবস্থা।

পৌরসভার রাস্তার বেহাল দশা বর্ণনা করতে গিয়ে নীরব নামে নরসিংদী হাসপাতালের এক অ্যাম্বুলেন্সচালক বলেন, ‘নরসিংদী পৌরসভা আছে, কিন্তু তার বাপ-মা নেই। যদি বাপ-মা থাকত, তাহলে একটি পৌরসভার অবস্থা এতটা খারাপ হতো না।’ তিনি দাবি করেন, জেলখানা মোড় থেকে বাসাইল যাওয়ার পথে ৩০-৩৫টি হাসপাতাল আছে। রাস্তা ভাঙা থাকার কারণে রোগীরা ঠিকমতো আসতে পারছেন না। বৃষ্টি হলে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে যায়। হাঁটুপানি ভেঙে কীভাবে রোগীরা হাসপাতালে আসবেন? তাঁর দাবি, পৌরসভার রাস্তাগুলো যেন দ্রুত মেরামত করা হয়।

বাসাইল রোডের দোকানে থাকা ফরহাদ নামের এক ব্যক্তি জানান, জেলখানার মোড় থেকে বাসাইল রোডে দৈনিক ৩-৪ বার গাড়ি উল্টে যায়। এখানে আসা অধিকাংশ যাত্রীই রোগী। গত ৩ দিন আগে রোগী বহনকারী একটি গাড়ি উল্টে পড়ে যায়। পরবর্তীতে জানতে পারি, তাঁর বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে প্রতিদিনই গাড়ি উল্টে যায়।

ফরহাদ নামের ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এই রাস্তার দায় পৌরসভাও নেয় না, সওজও নেয় না। নরসিংদী পৌরসভা ঠিকই ট্যাক্স নিচ্ছে, তাহলে রাস্তা ঠিক করবে না? জনগণের জন্যই তো রাস্তা হয়েছে। যদি এই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচলই করতে না পারে, তাহলে সেই রাস্তা দিয়ে লাভ কী? আজও একটি ৩ মাসের বাচ্চা গাড়ি থেকে পড়ে পানি খেয়েছে এবং দুজন মহিলাও পড়ে গেছেন। এই ময়লার পানি খেয়ে ভুগতে হচ্ছে। ড্রেন না থাকার কারণে বৃষ্টি হলেই পানি জমে। যদি ড্রেন পরিষ্কার থাকত, তাহলে পানি চলে যেত। কেউ উপকার করতে চায় না। গতবার একটি টিনের গাড়ি মেয়রের বাড়ির মোড়ে বাইজা গিয়েছিল। পরে আমরা ৫ হাজার টাকা সেই গাড়ি তুলি।’

নরসিংদী পৌরসভার বাসিন্দা ও অটোচালক হাসান মিয়া বলেন, ‘নরসিংদী পৌরসভার সকল রাস্তাঘাট ভাঙা। নরসিংদী আরশিনগরের জ্যামে পড়লে প্রায় ১ ঘণ্টা চলে যায়। এখানে একটি ফ্লাইওভার হওয়ার কথা। কিন্তু ১ বছরের ওপর থেকে এতটুকু কাজ করে বসে আছে। বাকি কাজের খবর নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন রেলগেট পড়ে, তখন রেললাইনের নিচ দিয়ে একটা রাস্তা আছে। সেই রাস্তা দিয়েও চলাচল করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ দুই লেনের রাস্তার এক লেন ময়লা ফেলে ভরে রাখা হয়েছে। যার ফলে এক পাশ দিয়েই দুই পাশের গাড়ি চলতে হয়। আর ময়লার দুর্গন্ধের কারণে আসা-যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

ভাঙা রাস্তার কারণে যখন-তখন গাড়ি উল্টে যায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাসান মিয়া বলেন, ‘ভাঙা রাস্তার কারণে আমাদের গাড়ি নিয়মিতই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর বৃষ্টির দিনে গাড়ি বেশি নষ্ট হয়। সেবা সংঘের মোড়ে এবং ইনডেক্সের সামনে রেগুলারই গাড়ি উল্টে যায়। রাস্তা ভাঙার কারণে এক-দুই ঘণ্টা জ্যামে থাকতে হয়। রাস্তা করে না, কিন্তু আমাদের থেকে টাকা ঠিকই নেয়। আমরা গরিব মানুষ। যে টাকা ইনকাম করি, তার থেকে বেশি খরচই চলে যায়।’

নরসিংদী পৌর শহরের রিকশাচালক দুলাল মিয়া বলেন, ‘প্রায় দুই বছর যাবৎই এসব রাস্তা ভাঙা। স্থানীয় কোনো মেয়র নেই এবং প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। যার ফলে এসব রাস্তা ভাঙা অবস্থায় থেকে যায়। আমাদের গাড়ির নিয়মিতই ক্ষতি হচ্ছে। যাত্রীদের কাছে তো আমরা অতিরিক্ত ভাড়া চাইতে পারি না। কিন্তু আমাদের গাড়ি ঠিকই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা অনেক জায়গায় ভাঙার কারণে যেতে না চাইলে বলে, যাবে না কেন? আমরা বলি, ১০ টাকার ভাড়া মেরে ৪০ টাকা গাড়ির পেছনে খরচ করতে হয়।’

নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পৌরসভার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী স্যার বলেন, ‘নরসিংদী পৌরসভার রাস্তা ভাঙা বলব না, রীতিমতো বিধ্বস্ত। আমরা বুড়ো মানুষ। আমরা রিকশা বা অটোতে যখন উঠি, আমাদের কোমরের হাড় নড়ে যায়। এই রাস্তা দিয়ে যুবক মানুষই চলতে পারে না। আমরা তো দূরের কথা। রাস্তায় বের হতে পারি না। বর্তমানে পৌরসভার যে বেহাল অবস্থা, এ থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রশাসক দিয়ে তো আর পৌরসভা চলে না, পৌরসভা চলতে হলে পৌর পিতাই দরকার।’

মোহাম্মদ আলী স্যার আরও বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তূপ পড়ে আছে। নাকে রুমাল দিয়ে চলতে হয় দুর্গন্ধের কারণে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। রাস্তার কাজ পৌরসভা কেন করছে না, বুঝতে পারছি না। তাদের কী বাজেট সংকট, নাকি অন্য কিছু? বাজেট সংকট হলে অল্প রাস্তা ভাঙা থাকত। একেবারে পুরো পৌরসভার রাস্তা ভাঙা। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ছাড়া আসলে পৌরসভা এতিম, কারণ পৌরসভার পৌরপিতাই নেই। দেখে-শুনে কে রাখবে?’

দীর্ঘদিন ধরে থেমে আছে নির্মাণকাজ। ছবি: আজকের পত্রিকা

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নরসিংদী আরশিনগর থেকে পুরান বাসস্ট্যান্ড পুরোটা ভাঙা। ভেলানগর থেকে শিক্ষা চত্বরের অধিকাংশ রাস্তা ভাঙা। শালিধা, ৫ নম্বর গেট, চৌয়ালা, বাগদী, ব্রাহ্মন্দী—সব এলাকাতেই রাস্তা ভাঙা। সামান্য জায়গা ভাঙা থাকলেও সেগুলো গাড়ি চলাচলের অনুপযোগী। নরসিংদী বাসাইল এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে পৌরসভা প্রশাসক নাদিরা আখতারের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘নরসিংদী পৌরসভার রাস্তা অধিকাংশই ভাঙাচোরা। এ বিষয়ে আমরা কনসার্ন আছি। আমরা সচেতন আছি। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা মেরামত করতে পারিনি। তবে নরসিংদী পৌরসভার মেইন মেইন রাস্তা অলরেডি আমরা টেন্ডার করে ফেলেছি।’

পৌরসভা প্রশাসক নাদিরা আখতার বলেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষা ও বৃষ্টির কারণে কন্ট্রাক্টররা কাজ ধরতে পারেনি। পরীক্ষা শেষ, এখন বৃষ্টিও মোটামুটি কমে গেছে। এখন আমরা কাজ ধরব। আগামী দুই মাসের মধ্যে মেইন মেইন রাস্তাগুলোর কাজ শেষ করে ফেলব। ভাঙাচোরা রাস্তা দ্রুতই ঠিক হবে।’

প্রশাসক নাদিরা আখতার আরও বলেন, ‘নরসিংদী জেলখানা মোড় থেকে নরসিংদী চক্ষু হাসপাতালের রাস্তাটি আমাদের নয়। সেটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের। তারা কাজ করবে সেটির। নরসিংদীর যেসব জায়গায় ময়লা ফেলা হয়, সেগুলো যেন না ফেলে, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব।’

নরসিংদী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজা-ই-রাব্বি বলেন, ‘চক্ষু হাসপাতালের রাস্তাটি বর্তমানে আমাদের অধীনে নেই। সেটি চলে গেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অধীনে।’