হোম > সারা দেশ > নওগাঁ

কীটনাশকের সহজলভ্যতায় নিয়ামতপুরে ৮ মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা ২০০ জনের

নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি

নওগাঁর নিয়ামতপুরে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন অন্তত ২০০ জন। তাঁদের মধ্যে ১৯৪ জন কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় নিয়ামতপুরে কীটনাশক সহজলভ্য। দোকানে সহজে কীটনাশক পাওয়া যাওয়া যায়। এ অবস্থায় কোন ধরনের ঝগড়া, মারামারি বা দুঃখের ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে তাৎক্ষণিক তা পান করার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কীটনাশক পান, গলায় ফাঁসসহ বিভিন্ন উপায়ে আত্মহত্যার চেষ্টার পর চিকিৎসা নিয়েছেন ২০০ জন। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বয়ঃসন্ধিকালের তরুণ-তরুণী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৭ জন, মার্চে ২৮, এপ্রিলে ৩১, মে মাসে ২৯, জুনে ৩২, জুলাইয়ে ২৪ এবং আগস্টে ২৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, সহিষ্ণুতার অভাব, সাংসারিক মনোমালিন্য, মানসিক চাপ, হতাশা, মুঠোফোন ও ডিজিটাল পর্দায় অতিরিক্ত আসক্তি, পারিবারিক কলহ, অপরিণত প্রেমের সম্পর্ক, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।

উপজেলা সদর ইউনিয়নের ২০ বছর বয়সী সবুজ (ছদ্মনাম) কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘পারিবারিক কলহ থেকে মুক্তি পেতে আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি।’

একই ইউনিয়নের এক গৃহবধূ বলেন, ‘অল্প বয়সে বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাটি হতেই থাকত। সেই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।’

গত ২২ জুলাই উপজেলার পাঁড়ইল ইউনিয়নের পশ্চিম মীরাপাড়া এলাকায় স্বামীর ওপর অভিমান করে দেড় বছরের একমাত্র সন্তানকে হত্যার পর এক মা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বেঁচে যান।

ওই মা বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরে নিজেও বিষপান করেছি। অশান্তি থেকে বাঁচতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফয়সাল নাহিদ বলেন, ‘দিন দিন মানুষের ধৈর্যশক্তি, সহ্যশক্তি কমে আসছে। ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হচ্ছেন না তাঁরা। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৯৪ জন কীটনাশক পান করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসা শেষে তারা বাড়িতে ফিরেছেন।’

সরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ফয়সাল নাহিদ।

নিয়ামতপুর সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ওবাইদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘স্মার্টফোনের অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, নৈতিক শিক্ষার অভাব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতাসহ বিভিন্ন কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রবণতা প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, বাড়াতে হবে পারিবারিক বন্ধন। সামাজিক অস্থিরতাও এর কারণ হতে পারে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতেও অনেক তরুণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুর্শিদা খাতুন বলেন, ‘নিয়ামতপুরে উদ্বেগজনকভাবে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব কমানোর জন্য পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।’