হঠাৎ টালমাটাল হয়ে উঠেছে নওগাঁর চালের বাজার। এই জেলায় উৎপাদিত সুগন্ধি (আতপ) চালের কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয়, বেড়েছে ৮০ টাকা।
গেল তিন সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা।
ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর করপোরেট কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেটের কারণে বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সরকারিভাবে রপ্তানি আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণে ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের কথা বললেও বাস্তবে দেখা মেলেনি কারোরই।
দেশে চাল উৎপাদনে যেসব জেলা এগিয়ে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারা দেশের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। এই জেলার বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গেল তিন সপ্তাহের ব্যবধানে শর্টার, নন-শর্টারসহ সব ধরনের কাটারির দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। কয়েক দিন আগেও এর দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। এক মাস আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকায়। তবে এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা।
আতপ চাল কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি, সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এভাবে হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’
আব্দুর রহিম নামের আরেক ক্রেতা ৫ কেজি চাল কিনতে এসেছিলেন। বললেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চালের দাম বাড়া নিয়ে হতাশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ‘৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসায় জীবনে এতটা দাম কখনো দেখিনি; বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বাড়ার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ারের অভিযোগ, কিছু বড় মিলার ও করপোরেট ব্যবসায়ী মৌসুমের
শুরুতে চাল কিনে মজুত করেছেন। তাঁরাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকেরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত এবং অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরে আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়ে রেখেছে। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ রপ্তানি হচ্ছে। যার কারণে এর দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আর আতপের জোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালের ওপর। তাই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত রপ্তানির কারণেই দাম বেড়েছে কিছুটা। নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪০০ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়ত মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুত অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
তবে এলাকাবাসী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যে তদারকি থাকার কথা, তা নেই। থাকলে এই পরিস্থিতি হতো না।
নওগাঁ চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, চিনিগুঁড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।