হালুয়াঘাট উপজেলার একটি হাটের পাশে বসে আছেন আ. খালেক (৫৭)। শরীর হালকা কুঁজো, চোখেমুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্বের ছাপ। পাশে তাঁর কিশোর ছেলে শাওন (১২-১৩)। এক হাতে ঝালমুড়ির প্লেট, অন্য হাতে চামচ—নিজে খাওয়ার ফাঁকে বাবার মুখেও তুলে দিচ্ছে খাবার। নীরব এ দৃশ্য যেন এক ভেঙে পড়া জীবনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
আ. খালেকের বাড়ি উপজেলার ধারা ইউনিয়নের কয়রাহাটি এলাকায়। দুই বছর আগেও পরিবারটি ছিল স্বাভাবিক। ভ্যানচালক খালেক ভোরে বের হয়ে সন্ধ্যায় ফিরতেন। সেই আয়েই চলত সংসার। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ছোট হলেও ছিল স্থিতিশীল জীবন। দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন তিনি।
হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনা সবকিছু পাল্টে দেয়। গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় খালেককে। এতে শেষ হয়ে যায় সঞ্চয়, করতে হয় ধারদেনা। মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
এখন তাঁর হাত-পা প্রায় অবশ। নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটা তো দূরের কথা। বসা-ওঠাও কষ্টকর। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে যন্ত্রণায়। কখনো তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন, আবার কখনো নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন শূন্যে। একসময় যে মানুষটি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, আজ তিনি নিজেই পরিবারের ওপর এক কঠিন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন—এই সত্যটি তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কাঁপা কণ্ঠে আ. খালেক বলেন, ‘আমি এখন নিজের কিছুই করতে পারি না। খাওয়া, বসা, কোথাও যাওয়া সবকিছুতেই অন্যের সাহায্য লাগে। এইভাবে বেঁচে থাকা খুব কষ্টের। আগে আমি সংসার চালাতাম, এখন ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
কিছুটা থেমে আবার বলেন, ‘চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক ঋণ হয়ে গেছে। কাজ করার কোনো উপায় নেই। কীভাবে সংসার চলবে বুঝতে পারি না। আমার জন্যই ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেল—এই কষ্টটা সবচেয়ে বেশি লাগে।’
এই অসহায় বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর কিশোর ছেলে শাওন। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই তাকে নিতে হয়েছে সংসারের দায়িত্ব।
শাওন জানায়, সে আগে নিয়মিত স্কুলে যেত। পড়াশোনাও ভালো লাগত। কিন্তু বাবার দুর্ঘটনার পর আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ‘আগে পড়ালেখা করতাম। এখন আর পারি না। আব্বাকে নিয়ে বের হতে হয়। না গেলে বাসায় খাবার থাকে না,’—নিম্ন স্বরে বলে সে।
প্রতিদিন সকালে বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বের হয় শাওন। হালুয়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চায়। কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো দোকানে দোকানে গিয়ে। কেউ কিছু দিলে নেয়, না দিলে চুপচাপ সামনে এগিয়ে যায়। দিনের শেষে যা পায়, তা দিয়েই কিনতে হয় বাবার ওষুধ, চাল-ডাল, চালাতে হয় পুরো সংসার।
পরিবারের অবস্থা আরও নাজুক করে তুলেছে শাওনের মায়ের পরিস্থিতি। মা ফজিলা খাতুন (৫৫) বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সংসারের কাজ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই তিনি। ফলে সব দিক থেকেই একা হয়ে পড়েছে পরিবারটি। দুই বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তাঁদের কাছ থেকেও নিয়মিত সহায়তা পাওয়া যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই খালেকের পরিবারটি চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এলাকার মানুষ সহানুভূতি থেকে মাঝেমধ্যে সাহায্য করেন। কিন্তু তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান হচ্ছে না। বরং খালেকের শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
প্রতিবেশী ছুলেমান বলেন, ‘খালেক আগে খুব পরিশ্রমী মানুষ ছিল। নিজের চেষ্টায় সংসার চালাত। এখন তাকে এই অবস্থায় দেখে খুব খারাপ লাগে। একেবারে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে।’
শফিকুল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘ছেলেটাও ছোট। এই বয়সে তার যা করার কথা, তা করতে পারছে না। বাবাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে—দেখলে কষ্ট লাগে।’
সরকারি সহায়তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে পরিবারটির। এখনো তারা নিয়মিত কোনো ভাতা পাচ্ছে না বলে জানান স্থানীয়রা।
তবে হালুয়াঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সানিয়াত সন্ধানী বলেন, ‘তাঁরা যদি প্রতিবন্ধী ভাতা না পেয়ে থাকেন, তাহলে তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া চিকিৎসা সহায়তার জন্যও আবেদন করলে সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব।’