মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম ব্যবহার করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৬ শিক্ষকের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গরিব ও অসহায় শিক্ষার্থীদের নগদ ৪ হাজার ৫০০ টাকা, শিক্ষা উপকরণ ও বিভিন্ন উপহারসহ ১০ হাজার টাকা মূল্যের প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার কথা বলে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, সিরাজদিখান উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদ্য সাবেক ফিল্ড সুপারভাইজার রেশমা খানমের অধীনস্থ কেয়ারটেকারদের মাধ্যমে দুটি মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে আবদুল্লাহ আল মামুন ও আলী আকবর চৌধুরী নামে দুই ব্যক্তি নিজেদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয় দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা প্রতি প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য ৫৮০ টাকা করে অগ্রিম জমা দিতে বলেন। পরে অনুদান বা পণ্য দেওয়ার সময় ওই টাকা সমন্বয় করা হবে বলেও জানান।
এ ঘটনায় উপজেলার অন্তত ৫০ জন শিক্ষক প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকরি বা কেন্দ্র বাতিলের আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
অভিযোগকারীদের মধ্যে ছয়জন শিক্ষক তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, কেয়াইন ইউনিয়নের মাওলানা মো. মিজানুর রহমানের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা, বালুচর ইউনিয়নের মাওলানা হারুনুর রশিদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা, রাজানগর ইউনিয়নের জসিম উদ্দিনের কাছ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকা, বালুচর ইউনিয়নের মাওলানা মাহমুদুর হাসানের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা, কেয়াইন ইউনিয়নের মাওলানা শহীদুল ইসলাম নাঈমের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং একই ইউনিয়নের মাওলানা কেফায়াতুল্লাহর কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
ছয়জনের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৫৯ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
ভুক্তভোগীরা জানান, ০১৩১৪৬৩৩৪৫১ ও ০১৩০৭৯৫০২৮১ নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন দফায় তাঁরা টাকা পাঠান। টাকা পাঠানোর পর সিরাজদিখান উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, আবদুল্লাহ আল মামুন ও আলী আকবর চৌধুরী নামে সেখানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নেই।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কোনো অনুদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে না বলে তাঁরা জানতে পারেন। পরে কথিত ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে মুঠোফোন নম্বর দুটি বন্ধ পাওয়া যায় বলে অভিযোগ তাঁদের।
বালুচর ইউনিয়নের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষক মাওলানা মাহমুদুর হাসান বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুদানের কথা বলে প্রথমে তাঁকে একটি মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে আবদুল্লাহ আল মামুন ও আলী আকবর চৌধুরী নিজেদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে টাকা জমা দিতে বলেন।
মাহমুদুর হাসানের দাবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার রেশমা খানমের কাছ থেকেই তিনি ওই নম্বর পেয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সহজ কোরআন শিক্ষার পাঁচজন শিক্ষার্থীকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা মূল্যের প্যাকেজ দেওয়া হবে।
পরে আরও বেশি শিক্ষার্থীর নাম দেওয়া যাবে এবং নিজের নামেও প্যাকেজ নেওয়া যাবে বলে তাঁকে জানানো হয়। সেই সঙ্গে প্রত্যেকের নামে ৫৮০ টাকা করে অগ্রিম জমা দিতে বলা হয়।
এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে কয়েক দফায় ৯০ হাজার টাকা পাঠান মাহমুদুর হাসান। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কোনো অনুদান বা পণ্য না পেয়ে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হয় তাঁর।
মাহমুদুর হাসান জানান, পরে সুপারভাইজার রেশমা খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে বাড়াবাড়ি না করার জন্য বলা হয়। বাড়াবাড়ি করলে তাঁর কেন্দ্র বাতিল হয়ে যাবে বলেও তাঁকে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বালুচর ইউনিয়নের আরেক শিক্ষক মাওলানা হারুনুর রশিদ জানান, তিনিও রেশমা খানমের কাছ থেকে একটি মুঠোফোন নম্বর পেয়ে আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমে পাঁচজন অসহায় শিক্ষার্থীর নাম দিতে বলা হলেও এলাকায় আরও গরিব, এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থী রয়েছে জানালে বেশি শিক্ষার্থীর নাম দেওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়।
হারুনুর রশিদ জানান, পরে তাঁকে আলী আকবর চৌধুরী নামে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তাঁদের কথামতো তিনি প্রথমে ৬ হাজার ৫০০ টাকা পাঠান। টাকা পাঠানোর পর তাঁকে সিরাজদিখানে এসে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সিরাজদিখান উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন নামে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি বলে জানান হারুনুর রশিদ। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া টাকা ফেরত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সাবেক সুপারভাইজার রেশমা খানম ও তাঁর অধীনস্থ কেয়ারটেকাররা কথিত প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে গজারিয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রেশমা খানম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সিরাজদিখানে থাকাকালে আমি এ ধরনের কোনো কাজ করিনি।’
সিরাজদিখান উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুমন মধু বলেন, ‘আমাদের অধিদপ্তর থেকে এমন কোনো অনুদান কর্মসূচি বা টাকা লেনদেনের সুযোগ নেই। প্রতারক চক্র সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের জালিয়াতি করেছে। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’