মৌলভীবাজার নাম শুনলেই অনেকের চোখের সামনে সবুজের রাজ্য ভেসে ওঠে। এর একদিকে চা-বাগান, অন্যদিকে কৃষি পন্যের আবাদ—মূলত এ দুটি কারণে চিরসবুজ এই জেলা। একটা সময় শ্রমিক ও কৃষি যন্ত্রাংশের অভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত পড়ে থাকলেও বর্তমানে তা চাষাবাদের আওতায় চলে আসছে। গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমি আবাদের আওতায় এসেছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এসব জমিতে এখন আম, আনারস, লেবু, মাল্টা, পেয়ারা, কাঁঠাল, বরই, পেঁপে, বেগুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও সবজি উৎপাদিত হচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, একটা সময় তাঁরা গরু বা মহিষ দিয়ে হালচাষ করতেন। এতে করে স্বল্প পরিমাণ জমিই চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হতো। তবে গত কয়েক বছর ধরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষকেরা পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পাশাপাশি এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করছেন। এতে করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক আর বাজারে চাহিদা পূরণ করছে উৎপাদিত ফসল।
মৌলভীবাজার জেলায় পাঁচ থেকে সাত বছর আগে যেসব জমি পতিত হিসেবে ধরা হতো, এখন সেসব জমি অনেক মূল্যবান হয়ে গেছে। কারষ এসব পতিত জমির মালিকেরা নিজে চাষ করছেন অথবা লিজ দিচ্ছেন। আবার কেউ অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে অন্যকে চাষ করতে দিচ্ছেন। জেলার সমতল থেকে শুরু করে উঁচু এলাকায় পতিত জমি আবাদের আওতায় এনে লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। এসব জমিতে বিশেষ ফল ও সবজি চাষ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ২০২০ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ হেক্টর আবাদি জমি ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর হয়েছে। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর পতিত জমি বিভিন্ন ফসলের আওতায় এসেছে।
জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর, শ্রীমঙ্গলসহ কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বছর পাঁচেক আগে যে জমি জঙ্গলে পূর্ণ ছিল, তাতে এখন সবজি বা ফলের বাগান হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলকায় ব্যাপক ভাবে ছোট ছোট বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বাগানে আনারস, লেবু, পেঁপে, মাল্টা, সুপারিসহ একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফল চাষ করা হচ্ছে।
জয়নাল মিয়া, হেলাল আহমদ, রুকন উদ্দিনসহ কয়েকজন কৃষক জানান, একটা সময় বাড়ির আশেপাশে অনেক জমি খালি পড়ে থাকত। জমি একটু নিচু হলেই সবাই ফেলে রাখতো। তবে গত কয়েক বছর ধরে আধুনিক কৃষি যন্ত্রের সাহায্যে অনেকেই ফেলে রাখা জমিতে ফসল চাষ করছেন। যদিও কৃষিতে খরচ অনেক বেড়েছে, তবু অনেকে কৃষিতে মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ, ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারলে সারা বছরই ভালো দামে বিক্রি করা যায়।
কৃষি উদ্যোক্তা আজাদুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ৬ একর জায়গা লিজ নিয়ে বাগান করেছি। এই জায়গা একসময় পতিত ছিল। এখানে আমি প্রথমে নার্সারি ও ফুলবাগান করেছি। তারপর বরই, লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজির বাগান করেছি। বছরে সব খরচ বাদে এখান থেকে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা আয় হয়। আমরা যখন এই জমি লিজ নিয়েছিলাম, তখন জঙ্গল ছিল। অথচ এখন এই জায়গাকে সবাই বরই বাগান নামে চেনে।’
কমলগঞ্জের রাজু আহমেদ নামে এক কৃষক বলেন,‘আগে শুধু শীতকালে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ চাষ করতাম। তবে এখন সারা বছর এসব সবজি উৎপাদন করি আমরা। অসময়ে চাষ করার জন্য শুধু পরিচর্যাটা একটু বেশি করতে হয়। আগে যে জমিতে বছরে একবার চাষ করা হতো, এখন সেই জমিতে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, ‘প্রতিবছর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে। বিশেষ করে আনারস, মাল্টা, লেবুসহ বিভিন্ন বাগান করা হচ্ছে। পাশাপাশি লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজির বাগানও করছেন কৃষক। যত সময় যাবে, পতিত জমি আবাদের আওতায় আসবে।’