বর্ষা পেরিয়ে চলছে শরৎকাল। ভাদ্রের শেষে শরতেও মানিকগঞ্জের নদ-নদীতে বাড়ছে পানি। চর ও নিম্নাঞ্চলের পথঘাটে তাই আবারও প্রয়োজন হয়ে উঠেছে নৌকা। কৃষিপণ্য ও গবাদিপশুর খাবার পরিবহন, মাছ ধরা কিংবা হাটবাজারে যাতায়াত করতে অনেক এলাকার মানুষের কাছে এখনো কাঠের নৌকাই ভরসা। নদ-নদীতে পানি বাড়ায় শরতেও জমে উঠেছে ঘিওর ও হরিরামপুরের ঝিটকার শতবর্ষী নৌকার হাট।
ঘিওরের হাট বসে প্রতি বুধবার। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শত বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে এ হাট। প্রতি বুধবার হাটে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার নৌকা বিক্রি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ছোট ডিঙি নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে কৃষিপণ্য, পশুখাদ্য ও অন্যান্য মালামাল পরিবহনের জন্য তৈরি হয় বড় নৌকাও। পানির গভীরতা, ধারণক্ষমতা ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বদলে যায় নৌকার আকার ও কাঠামো।
ঘিওর হাটে নৌকা বিক্রি করতে আসা কানাই লাল সূত্রধর বলেন, ফের পানি বাড়ায় নৌকার চাহিদা বেড়েছে। ছোট নৌকাই বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঠ, লোহা ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরির খরচও আগের তুলনায় বেশি।
নৌকা কিনতে আসা আশাপুর গ্রামের কৃষক জমসের আলী জানান, তাঁর এলাকায় পানি বাড়ায় নৌকার প্রয়োজন হয়েছে। কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও এদিক-ওদিক যাতায়াতের জন্য একটি নৌকা দরকার ছিল। হাটে বিভিন্ন দামের নৌকা থাকায় পছন্দমতো কেনার সুযোগ রয়েছে।
নৌকার কারিগর অখিল সূত্রধর বলেন, নৌকা তৈরিতে ব্যবহার হয় রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বল, মেহগনিসহ বিভিন্ন কাঠ। সঙ্গে লাগে লোহা, পেরেক, তারকাঁটা ও রং। কাঠ, উপকরণ ও দক্ষ শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় বেড়েছে নৌকা তৈরির খরচও। আরও এক কারিগর পরিতোষ বলেন, আগের তুলনায় কাজ কমেছে। পানি বাড়লেই নৌকার চাহিদা বাড়ে, তখন কাজও বাড়ে। এই মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভর করে অনেক কারিগরের সংসার।
একই চিত্র হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা নৌকার হাটে। প্রতি শনিবার বসা এ হাট ব্রিটিশ আমলের বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। একসময় এখানে কয়েক শ নৌকা উঠলেও এখন প্রতি হাটে আসে ৬০-৭০টি। তবে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে ক্রেতার ভিড়ও বাড়ে।
চরআজিমপুর গ্রামের ক্রেতা আজিজুল মিয়া বলেন, পানি বাড়লে কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও বাজারে যাতায়াতে নৌকার প্রয়োজন হয়। তাই বর্ষা শেষ হলেও নৌকার চাহিদা কমেনি।
নৌকার পাশাপাশি হাটে বিক্রি হয় বইঠা। বইঠা বিক্রেতা অজয় সূত্রধর বলেন, নৌকার বিক্রি বাড়লে বইঠার চাহিদাও বাড়ে। ফলে শুধু নৌকা নির্মাতা নন, কাঠ ব্যবসায়ী, করাতকলের শ্রমিক, বইঠা নির্মাতা, কামার, রং বিক্রেতা, পরিবহনশ্রমিক, দিনমজুরসহ বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই হাট।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, ঘিওরের নৌকার হাটটি শত বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। প্রতি বুধবার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা আসে এবং ক্রেতারাও আসেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। নদী ও চরাঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এই হাট স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে।