সকাল ৮টা। বিদ্যালয়ে আসতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষ ও বারান্দা ঝাড়ু দিচ্ছেন একজন শিক্ষক। কিছুক্ষণ পর তাঁকেই দেখা গেল বিদ্যালয়ের শৌচাগার পরিষ্কার করতে। এমন দৃশ্য দেখা গেছে সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
আলাপে জানা গেল, এই বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ঝাড়ুদার কিংবা মালি নেই। বিদ্যালয়ে ঘণ্টা বাজানোর কাজ করেন দপ্তরি। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা, ঘণ্টা বাজানোসহ দৈনন্দিন নানা কাজও করতে হচ্ছে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের।
সাটুরিয়া উপজেলার চক মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও একই চিত্র পাওয়া যায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরীর পদে জনবল নেই। ফলে শিক্ষকদেরই বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক কাজও করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে গতকাল রোববার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ বন্ধ। সমস্যাটি সমাধানে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। প্রাথমিক শিক্ষার নতুন নীতিমালায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং দপ্তরি পদ সৃষ্টির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে এক কোটির বেশি। শিক্ষক রয়েছেন পৌনে চার লাখের বেশি।
সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি, বর্তমানে কর্মরত ৩ লাখ ৫২ হাজার ২০৮ জন।
দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২৮ হাজার ২০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাকি ৩৭ হাজার ৩৬৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই পদে কোনো জনবল নেই। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী ছাড়াই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩ সালের আগে জাতীয়করণ করা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন ধাপে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং নিয়োগের কর্তৃত্ব নিয়ে উপজেলা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই পদে নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে গতকাল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) এ এস এম সিরাজুদ্দোহা বলেন, উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি সুরাহার জন্য কাজ চলছে।
দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী নেই—এমন কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষকদের কর্মদিবস শুরু হচ্ছে বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে। বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথমেই তাঁদের দেখতে হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ, বারান্দা, আঙিনা ও শৌচাগারের অবস্থা। কোথাও নিজেরাই ঝাড়ু দিচ্ছেন, কোথাও স্থানীয় কাউকে দিয়ে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করছেন।
এরপর শুরু হচ্ছে দাপ্তরিক কাজ। উপস্থিতির তথ্য তৈরি, চিঠিপত্র আদান-প্রদান, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ নানা দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে শিক্ষকদের। সব কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে তাঁদের।
জানতে চাইলে রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিথীকা রানী রায় বলেন, বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী নেই। নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ঝাড়ুদার বা মালি। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদেরই বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক ও আনুষঙ্গিক অনেক কাজই করতে হয়।
সাটুরিয়ার রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী লামহার মা বিউটি আক্তার বলেন, বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। তবে শিক্ষককে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হলে পাঠদানের জন্য তাঁর সময় কমে যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চর বারইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দপ্তরি না থাকায় শিক্ষকতার পাশাপাশি কর্মচারীর দায়িত্বও পালন করতে হয়। এতে একসঙ্গে সব দায়িত্ব সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়, প্রায় সব আনুষঙ্গিক দায়িত্ব প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সামলাতে হয়। ফলে একই ব্যক্তিকে শিক্ষক, প্রশাসক ও সহায়ক কর্মীর ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।
ঢাকার সাভারের ইমামদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেফালী আক্তার বলেন, ‘দপ্তরি না থাকায় শৌচাগার পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও অনেক সময় আমাদেরই নিতে হয়। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরীর শূন্য পদে নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে জনবল নেই। এ দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকেরা। এতে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে তিনি সরকারের প্রতি দাবি জানান।