মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নের কাকজিনগর গ্রামে প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো চলাচলের রাস্তায় গেট নির্মাণ করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে ওই পথ ব্যবহারকারী ১৮টি পরিবার কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও রাস্তাটি এখনো বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত চলাচলের পথটি জমি নিয়ে বিরোধ ও স্থানীয় রেষারেষির জেরে সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাস্তাটির প্রবেশমুখে স্থায়ী গেট নির্মাণ করে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, রাস্তা উন্মুক্ত রাখার দাবিতে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী নাসরিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি দেখেন। রাস্তাটি সচল রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধও করা হয়।
তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, ইউএনও পরিদর্শনের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং পরে গেটে নতুন করে তালা ঝুলিয়ে রাস্তাটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী আব্দুল করিম কাজী বলেন, ‘এটি প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো রাস্তা। আমাদের বাপ-দাদারা এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমরাও এই পথ ব্যবহার করছি। বর্তমানে স্থানীয় বিরোধের কারণে মোক্তার হোসেন রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছেন।’
আব্দুল করিম কাজী আরও বলেন, ‘২০১৪ সালে সরকারি উদ্যোগে রাস্তা তৈরির জন্য মাঠে মাটি ফেলা হয়েছিল। কিন্তু জমি নিয়ে বিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত রাস্তাটি আর সচল করা যায়নি। এখন পুরোনো চলাচলের পথেও গেট বসিয়ে তালা দেওয়া হয়েছে। এতে ১৮টি পরিবার চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের চলাচলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। চাকরিজীবীদের অনেকে রাতে বাড়ি ফেরেন। গেটে তালা থাকায় তাঁদের অনেক দূরের বিকল্প পথ ঘুরে বাড়িতে যেতে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাস্তাটি বন্ধ থাকায় অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিশুদের স্কুল-কলেজে যাওয়া এবং কর্মজীবীদের কর্মস্থলে যাতায়াতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কোনো বাসিন্দা মারা গেলে মরদেহ বহন করেও বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিক্তা আক্তার। স্থানীয়ভাবে বসে চলাচলের পথ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের বিষয়ে মোক্তার হোসেন বলেন, ‘যে জায়গায় গেট দেওয়া হয়েছে, সেটি আমাদের ব্যক্তিগত জায়গা। আমাদের ব্যক্তিগত জায়গার ওপর দিয়ে কোনো রাস্তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা কারও চলাচলে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দিতে চাই না। তবে আমাদের নিজস্ব জমি ব্যবহার করে রাস্তা দিতে রাজি নই। জমির মালিকানা ও রাস্তার বিষয়টি নিয়ে যদি কোনো বিরোধ থাকে, তাহলে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র যাচাই করে যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা তা মেনে নেব। ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে রাস্তা দেওয়ার দাবি করে জোর করে গেট খুলে দেওয়ার বিষয়টি আমরা মেনে নিতে পারি না।’
দিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতার উদ্দিন আহমেদ (রাজা) বলেন, ‘বিষয়টি দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বসা হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন। বিষয়টি সমাধানে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত চলাচলের পথটি দ্রুত উন্মুক্ত করে দিয়ে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান করা হোক। ভবিষ্যতে যাতে কোনো পক্ষ গেট নির্মাণ বা তালা ঝুলিয়ে ১৮টি পরিবারের চলাচল বন্ধ করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা চান তাঁরা।