মাদারীপুরে একের পর এক পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা। প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি ও প্রভাবশালীদের দখলে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এসব জলাধার। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সময় পানিসংকটের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পুকুর বিলীন হতে থাকলে ভবিষ্যতে আগুন নেভাতে প্রয়োজনীয় পানির তীব্র সংকটে পড়তে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই যুগ আগেও মাদারীপুর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পুকুর ও ডোবা ছিল। বর্তমানে তা অর্ধেকের কমে নেমে এসেছে। জেলার মানুষজন ইউরোপমুখী হওয়ায় অনেকেই শহরে এসে জমি কিনে বাড়ি বানাচ্ছেন। অনেকেই আবার পুকুর ভরাট করে বেশি দামে জমি বিক্রি করছেন। পরে সেখানে মার্কেট, দোকানপাট ও বসবাসের জন্য ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে করে শহরের পুকুর-ডোবা বা জলাশয় কমে যাচ্ছে।
মাদারীপুর শহরের পুরান বাজারের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সোহাগ হাসান বলেন, পুরান বাজার হচ্ছে মাদারীপুর জেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি ঝুঁকির মধ্যে আছে। কারণ, এখানে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস যথাসময়ে পৌঁছালেও পানির সরবরাহ কম থাকায় নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাই এখানে মসজিদের পাশে যে পুকুরটি ময়লা-আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেছে, তা পুনরায় পরিষ্কার করে স্বরূপে ফিরিয়ে আনা দরকার।
শহরের শকুনি এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে শহরে অনেক পুকুর দেখা যেত। এখন বেশির ভাগ পুকুরই ভরাট হয়ে গেছে। এ জন্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহরের কোথায়ও আগুন লাগলে পানি পাওয়া যায় না। শহরের মধ্যে এখন যতগুলো পুকুর রয়েছে এগুলো যাতে আর ভরাট হতে না পারে সে ব্যাপারে প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে শহরবাসী হুমকির মধ্যে পড়বেন।
মাদারীপুরের পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অব নেচারের প্রতিষ্ঠাতা রাজন মাহমুদ বলেন, সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শহরে একের পর এক পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে শহরে এখন পর্যন্ত যে কয়টি পুকুর অবশিষ্ট আছে, তাও মাঝেমধ্যে প্রভাবশালীরা ভরাটের উদ্যোগ নেয়। যেমন মাদারীপুর শহরের লঞ্চঘাট এলাকার একটি শত বছরের পুরোনো পুকুর ৪-৫ বছর আগে তৎকালীন এমপি ভরাটের সিদ্ধান্ত নেন। ড্রেজারের মধ্যে বালু দিয়ে ভরাটও শুরু করে দেন। তখন ফ্রেন্ডস অব নেচারসহ স্থানীয় সুশীল সমাজ, এলাকাবাসী ও তৎকালীন পৌর মেয়রের প্রতিবাদের পর ভরাট বন্ধ হয়ে যায়। প্রশাসনের উচিত বর্তমানে শহরের যে কয়টি পুকুর আছে, তা বাঁচিয়ে রাখা। আর এতে করেই শহরের মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হবে।
মাদারীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদারীপুর শহরে এখন পানির উৎস কম। সম্প্রতি শহরের পুরান বাজারে আগুন লেগে ১৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে গেছে। ওই এলাকায় পানিস্বল্পতা থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে।
মাদারীপুর পৌরসভার পৌর প্রশাসক মোছা. জেসমিন আকতার বানু বলেন, মাদারীপুর পৌরসভা এলাকায় দিনে দিনে পুকুরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। শহরের জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন আর কাউকে পুকুর বা জলাশয় ভরাট করতে দেওয়া হবে না। শহরে এখন যে পুকুরগুলো আছে, তা সংরক্ষণ করা হবে।