হোম > সারা দেশ > লালমনিরহাট

ভূমিহীনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেদের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত

পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি

প্রতারণার অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করে ভূমিহীন পরিবারগুলো। ছবি: আজকের পত্রিকা

সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ার কথা বলে ও নিজেদের সরকারের লোক পরিচয় দিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ভূমিহীন অসহায়দের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ঝালঙ্গী গ্রামের এই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছে একাধিক ভূমিহীন পরিবার। প্রতিকার পেতে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, ওই এলাকার ছক্কর আলী নিজেকে সরকারের লোক পরিচয় দিতেন। অর্থের বিনিময়ে ছক্কর আলীসহ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা ভূমি কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। খাসজমি বন্দোবস্তের স্বাভাবিক কবুলিয়ত প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে প্রকৃত ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে ভূমিহীন সাজিয়ে ধনাঢ্য পরিবারগুলোর নামে জমি বন্দোবস্ত ও কবুলিয়ত দেওয়া হয়েছে।

এতে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই ও জীবন-জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় জমি না পেয়ে এসব পরিবার এখন চরম সংকটে পড়েছে।

এসব ঘটনার সঠিক তদন্ত দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। অনিয়ম করে দেওয়া জমির কবুলিয়ত বাতিল এবং ছক্কর আলীসহ অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলন করেছে ভূমিহীন পরিবারগুলো। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কৃষাণী ও গৃহিণী ফরিদা বেগম।

সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ভূমিহীন পরিবারগুলো দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর ধরে ওই খাসজমিতে বসবাস করে আসছে। জমি কবুলিয়তের জন্য উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে একাধিকবার আবেদন করা হয়। কিন্তু আবেদনপত্রগুলো প্রতিবারই গায়েব হয়ে যায়। পরে প্রকৃত ভূমিহীনদের নামে খাসজমির বন্দোবস্ত না হওয়ায় ছক্কর আলীর নেতৃত্বে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের নামে কবুলিয়ত নিয়ে ভূমিহীন পরিবারদের উৎখাত করতে একের পর ষড়যন্ত্র করতে থাকেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ইউনিয়নের ঝালঙ্গী এলাকায় ১১ দশমিক ৩৭ একর জমির মালিক বানীকান্ত নিয়োগী, বরদাকান্ত নিয়োগী, সিতিকান্ত, মহেশকান্ত, হেমকান্ত ও যামিনীকান্ত। তাঁরা সপরিবারে নিরুদ্দেশ এবং তাঁদের কোনো ওয়ারিশ না থাকায় ওই জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে সরকার ওই জমি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে খাসের খতিয়ানভুক্ত করে এবং ২২টি ভূমিহীন পরিবারকে লিজ দেয়। বর্তমানে ওই জমিতে সরকারি গুচ্ছগ্রামের ঘরে প্রায় ৩০টি পরিবার বসবাস করছে।

পরে ২০০৮ সালে এসব পরিবার একই এলাকার ছক্কর আলীকে খাসজমির বন্দোবস্ত করে দিতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা ভূমি কার্যালয়ে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দেন। পরে ছক্কর আলী জমির বন্দোবস্ত করে দেওয়ার কথা বলে ওই পরিবারগুলোর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেন। কিন্তু তাঁদের নামে বন্দোবস্তের ব্যবস্থা না করে ছক্কর আলী ও তাঁর নিজের লোকদের নামে করে নেন।

জানা গেছে, ছক্কর আলীর মা কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারহাটের আয়শা বেগম, শ্রীরামপুর ইউনিয়নের বেলেরবাড়ি গ্রামের ভাতিজির জামাই আব্দুর রশিদ, ভগ্নিপতি সুরুজ ও ভাগনে তোতার নামে ৫০ শতক করে এবং ভাইয়ের নামেও জমির কবুলিয়ত দলিল করে নেন। এর পর থেকে ভূমিহীন পরিবারগুলোর বসতভিটাসহ ফসলি জমি দখলে নিতে উঠে পড়ে লাগেন এবং আদালতে হয়রানিমূলক মামলা করেন ছক্কর আলীরা।

অভিযোগের বিষয়ে ছক্কর আলী বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি, প্রতারণাও করিনি। ওই পরিবারগুলো সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সরকার আমাকে দায়িত্ব দেওয়ায় মামলা মোকাবিলা করেছি। এ জন্য সরকার আমাদের খাসজমি কবুলিয়ত করে দিয়েছে।’

এই ব্যাপারে জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তের নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সরকারি লোক সেজে বন্দোবস্ত করার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। বিষয়টি জেনেছি, মাঠপর্যায়ে খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’