হোম > সারা দেশ > লক্ষ্মীপুর

রায়পুরে মা ও ৩ মেয়েকে কুপিয়ে হত্যায় ‘ঘাতকের’ পরিচয় নিয়ে যা জানা গেল

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

হত্যাকাণ্ডের শিকার মা ও তিন মেয়ে (বামে), স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদার। ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ও গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদার নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি পরিচয় দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন আফরোজা বেগম নামে পরিবারটির প্রতিবেশী এক নারী। তবে তাঁর আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আফরোজা বেগমের তৎপরতায় পালাতে পারেননি অন্তর।

পরে জানা যায়, নিহত অন্তর নিজেকে ‘জহির’ নামে মুসলিম পরিচয় দিয়ে এক নারীকে নিয়ে ওই ভবনে এক বছর ধরে বসবাস করেছিলেন।

আফরোজা বেগম সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনার সময় তিনি অন্তরের হাতে প্যান্ট নিয়ে ঘরের ভেতরে দেখতে পান। জানালা দিয়ে তাকে ওই বাসায় অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে অন্তর নিজেকে কল ও পাইপলাইন মেরামতের মিস্ত্রি বলে পরিচয় দেন।

এ প্রসঙ্গে আফরোজার ভাষ্য, ‘তাঁর (অন্তর) হাতে প্যান্ট ছিল। বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। আমি ভাবলাম, হয়তো শাহিনুর বাসায় নেই। কলের মিস্ত্রি পরিচয়ে এসে মেয়েদের সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়।’

এর কিছুক্ষণ আগে ওই ঘরের ভেতর থেকে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুনে জানালার পাশে দৌড়ে গিয়েছিলেন বলে জানান আফরোজা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শাহিনুর বেগমকেও ডাকেন তিনি, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি বলে উল্লেখ করেন।

প্রতিবেশী আফরোজা বলেন, ‘প্রথমে চিৎকার শুনছিলাম। পরে হঠাৎ সব চুপ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর জানালা দিয়ে দেখি একজন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, ওটা হয়তো শাহিনুরের ছেলে সিফাত। আমি সিফাত বলে ডাকলাম, কিন্তু তারও কোনো উত্তর পাইনি। কিছুক্ষণ পর আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করার শব্দ শুনি। তখন আমার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।’

পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আফরোজা বাইরে থেকে বাসার দরজা আটকে দেন এবং আশপাশের লোকজনকে খবর দেন। পরে প্রতিবেশীরা একসঙ্গে ঘরে ঢুকে মেঝে জুড়ে রক্ত এবং মা ও তিন মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর জন্য ভবনের ছাদে উঠে যান। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে গণপিটুনি দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। সেখানে চিকিৎসাধীন বেলা আড়াইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

গত বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের স্কুলশিক্ষকের ভাড়া বাসায় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

নিহতেরা হলেন মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে ঢাবি শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহতের নাম অন্তর মজুমদার (৩৫)। নিহত সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তাদের পিতা কামাল হোসেন ২০১৯ সালে কেরোয়া গ্রামে রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যান।

পরিবারটির বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

অন্যদিকে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাট বাসিন্দা। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর রায়পুরে ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন।

ঘটনার পরদিন শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে অন্তর মজুমদারের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে স্বজনেরা তাঁর মরদেহ নিতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে বাধ্য করে দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই টিটু মজুমদারের কাছে তাঁর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াকুব।

এসআই আরও জানান, শুক্রবার দুপুরে সদর হাসপাতালে মা ও তিন মেয়ের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রায়পুর গোডাউন রোডে জানাজা শেষে কুমিল্লার হোমনায় নিজ গ্রামে রাত সাড়ে ১০টায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দুই স্থানেই পরিবারটির বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত তার মা ও বোনদের হত্যাকাণ্ডে বিচার চেয়েছেন। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জিহাদুল ইসলাম শিফাত হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ ছাড়াও ঘটনায় অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেওয়ার সময় তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে ৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফলে থানার পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে রায়পুর থানায় আরও একটি মামলা দায়ের করেন। দুটি হত্যা মামলাই তদন্ত করছেন ওসি (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান। এ ছাড়াও চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি সিআইডি র‍্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাও তদন্ত করছে।

রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। হত্যার মূল কারণ এখনো উদ্‌ঘাটন করা যায়নি। প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।’

এ দিকে আজ শনিবার সকালে লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশের ডিআইজি মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনি শনাক্তের নির্দেশ দেন।

হোমনার লটিয়ায় পাশাপাশি কবরে শায়িত মা ও ৩ মেয়ে, বাকরুদ্ধ একমাত্র জীবিত সন্তান সিফাত

আমার মা ও বোনের হত্যার বিচার চাই: শিফাত

লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা

লক্ষ্মীপুরে হামলায় মা-দুই মেয়ে নিহত: বাঁচানো গেল না মেজ মেয়েকেও

রায়পুরে ঘরে ঢুকে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন

রায়পুরে মা ও দুই মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, আহত আরেক মেয়ে, সন্দেহভাজন আটক

রায়পুরে একই পরিবারের ৪ জনকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা, নিহত ২, আশঙ্কাজনক ২

লক্ষ্মীপুরে সাবেক এমপি আনোয়ার খানসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ৫

লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থী মেহেদী হত্যা: শিক্ষক-ছাত্রসহ গ্রেপ্তার ২

লক্ষ্মীপুরে যুবদল নেতার বাড়িতে অস্ত্র উঁচিয়ে ছোট ভাইয়ের গুলি, ভিডিও ভাইরাল