হোম > সারা দেশ > খাগড়াছড়ি

তৈছালা খাল: ধারদেনা করে চাষাবাদ, জলে ভেসে যায় কৃষকের স্বপ্ন

বেলাল হোসাইন, রামগড় (খাগড়াছড়ি) 

পানিতে তলিয়ে আছে ধানখেত। ছবি: আজকের পত্রিকা

ধানের চারা রোপণের সময় স্বপ্ন ছিল ফসল ঘরে তুলবেন। সেই ফসল বিক্রি করে চলবে সংসার, শোধ হবে ধারদেনা। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে এখন তলিয়ে আছে তাঁদের ধানখেত। ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে রামগড়ের কৃষকদের। গত সপ্তাহের টানা বৃষ্টির পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রামগড় পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার শত শত কানি ধানিজমি পানির নিচে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০০ কৃষক। প্রতি কানিতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে চাষ করা এসব কৃষক এখন ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

চৌধুরীপাড়া, পাইন্দাপাড়া, শম্প্রুপাড়া, মহামুনি, দারোগাপাড়া, পৌরসভা এলাকা ও সোনাইপুলের ধানখেতের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ তৈছালা খাল। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বিভিন্ন অংশ সরু ও ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও বাঁশঝাড়, কোথাও মাটি-আবর্জনা জমেছে, আবার কোথাও গড়ে উঠেছে স্থাপনা। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

মহামুনিপাড়ার কৃষক আফসার উদ্দীন পানিতে ডুবে থাকা জমির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই জমি তলিয়ে যায়। এবারও কয়েক দিন ধরে পানি জমে আছে। ধান চাষে যে খরচ করি, সেটাই উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে চাষ বন্ধ করে দিতে হবে।’

একটু থেমে তিনি বলেন, ‘ধান ফলাই, না পানি চাষ করি—এটাই এখন বুঝতে পারছি না।’

আরেক কৃষক রাপ্রু মারমা বলেন, ‘একটা খালই আমাদের ভরসা। সেই খালটাও যদি বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে পানি যাবে কোথায়? প্রতিবছর শুধু দরখাস্তই দিয়ে যাচ্ছি। কাজের কাজ কিছুই হয় না।’

কৃষকদের হিসাবে, প্রতি কানি জমিতে ধান চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। বীজ, সার, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের পেছনে এই অর্থ ব্যয় করেন তাঁরা। কিন্তু দিনের পর দিন জমি পানিতে ডুবে থাকায় অনেক কৃষক এবার ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় আছেন।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অনেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ফসল নষ্ট হলে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি তাঁদের ঘাড়ে থেকে যায় ঋণের বোঝা।

কৃষক মোহাম্মদ সোলেমান বলেন, ‘কিস্তিতে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছি। ফসলই যদি ঘরে তুলতে না পারি, তাহলে কিস্তি দেব কীভাবে? সংসার চালাব কীভাবে?’

সংস্কারের অভাবে তৈছালা খাল একপ্রকার ড্রেনে পরিণত হয়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এভাবে ফসল নষ্ট হতে থাকলে অনেকেই ধান চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৈছালা খালের সর্বশেষ সংস্কার হয়েছিল ১৯৮১ সালে। তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান কাজী রুহুল আমিনের তত্ত্বাবধানে ওই সংস্কার করা হয়। এরপর চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও খালটির বড় ধরনের সংস্কার বা পুনঃখনন হয়নি।

সময়ের সঙ্গে খালের দুই পাশে বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বাঁশঝাড়, মাটি ও আবর্জনায় অনেক জায়গায় খাল সংকুচিত হয়ে গেছে। বর্ষায় এর প্রভাব পড়ছে আশপাশের ধানখেতে।

গত বছর একই সমস্যার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেয় উপজেলা কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরেজমিনে গিয়ে জলাবদ্ধ জমি ও তৈছালা খালের অবস্থা পরিদর্শন করেন। পরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি খননের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করে চিঠি পাঠায় কৃষি কার্যালয়।

কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আবেদন বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে আবারও বৃষ্টিতে ডুবে গেছে শত শত কানি ধানিজমি।

কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আশা করেছিলাম এবার খাল খনন হবে। কিন্তু আবার বৃষ্টি এসে গেছে। এর মধ্যে আবারও পানিতে ডুবেছে শত শত কানি জমি। আর কতবার আবেদন করলে খুলবে তৈছালা খালের পথ?’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ সুমন মিয়া বলেন, ‘তৈছালা খাল খননের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে ইউএনও বরাবর আবেদন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমি নিজেও সরেজমিন গিয়ে কৃষকদের সমস্যাটি দেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘খালটি সংস্কার করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। কৃষকেরাও বিষয়টি নিয়ে বারবার যোগাযোগ করছেন।’

খাল খননের আবেদনের অগ্রগতি ও প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে ইউএনও কাজী শামীমের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।