একসময় বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালু আর ভাঙাচোরা পথে চলাচল ছিল দুর্ভোগের আরেক নাম। কৃষককে মাথায় করে ফসল আনতে হতো, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পোশাকে লেগে থাকত কাদার ছাপ। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।
জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকায় সবুজ ধানখেত চিরে এখন চলে গেছে পেভিং ব্লক ও আরসিসি সড়ক। দুই পাশে সারিবদ্ধ সুপারিগাছ, সৌরচালিত স্ট্রিট লাইট আর বসার বেঞ্চ মিলিয়ে এলাকাটি এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদেরও আকর্ষণের জায়গা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুই এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার আরসিসি-পেভিং সড়ক এবং মূলগ্রামের ভেতরে আরও প্রায় ৯০০ মিটার পেভিং ব্লক সড়ক নির্মাণ হয়েছে, ব্যয় প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সন্ধ্যার পরও সোলার লাইটের আলোয় নিরাপদে চলাচল করা যাচ্ছে।
মূলগ্রামের গৃহিণী আফরুজা বেগম বলেন, ‘ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় প্রতিদিন হাঁটতে হয়। আগে কাদার কারণে কষ্ট হতো, এখন সুপারিগাছে ঘেরা পরিবেশে হাঁটতে ভালো লাগে।’
সীতাহার-নয়াপাড়ার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, আগে কাদার কারণে ভ্যান-অটো ভ্যান গ্রামে ঢুকতেই চাইত না। এখন সহজেই মেলে ভ্যান, সিএনজি এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও, ফলে জরুরি রোগী দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে। মূলগ্রামের কৃষকেরা জানান, এখন ট্রাক-ভ্যান মাঠের কাছে যেতে পারায় সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার শম্পা কালাইয়ে বেড়াতে এসে সড়কের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেন, ‘সারি সারি সুপারিগাছ দেখে মনে হয় যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। বেঞ্চে বসে খোলা মাঠের হাওয়া উপভোগ করা সত্যিই অসাধারণ।’
কালাই পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গত এক বছরে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও ৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, যার সুফল পাচ্ছেন ২৩ হাজার ৬৬৩ জন বাসিন্দা। জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর বিশেষ বরাদ্দে মহাসড়ক, মূলগ্রাম, সীতাহার, থুপসাড়া, আওড়া, সড়াইল, মুন্সীপাড়া, পাঁচশিরা এবং স্থানীয় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে মোট ৩৫টি ছোট-বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
থুপসাড়া সেলিমীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মতিউর রহমান জানান, বছরের পর বছর অবহেলিত থাকা তাঁদের মাদ্রাসাসংলগ্ন সড়কেও এখন আরসিসি কাজ চলছে।
কালাই উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নওশাদ জানান, কালাই পৌরসভা এলাকায় ফসলের জমি, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩১০ হেক্টর। এর মধ্যে ফসলি জমি প্রায় ৮১৫ হেক্টর। কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল ওহাব সাখিদারের হিসাবে, পাকা সড়কের ফলে কৃষকদের প্রতি বিঘায় ফসল পরিবহনে গড়ে ১ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। প্রতি ফসলি মৌসুমে কৃষকদের মোট পরিবহন ব্যয় কমছে আনুমানিক ৬১ লাখ টাকা। পৌরসভা এলাকার অধিকাংশ জমি তিন ফসলি হওয়ায় বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। একই সঙ্গে সড়কসংলগ্ন জমির দামও বেড়েছে প্রায় তিন গুণ—প্রতি শতক ৩০-৪০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ২০-৩০ হাজার টাকা হয়েছে।
সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনে সুপারিগাছকে বেছে নেওয়ার পেছনে পরিবেশগত সুবিধা। এ বিষয়ে কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্য বড় গাছ ফসলের আলো-বাতাসে বাধা সৃষ্টি করে জমির ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সুপারিগাছ পরিবেশবান্ধব এবং ফসল বা জমির কোনো ক্ষতি করে না। আমাদের রোপণ করা ২ হাজার ৫০০ গাছ থেকে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব আসবে। মন্ত্রণালয় এটিকে সারা দেশের জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে।’
উন্নত সড়ক, কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ও জমির মূল্যবৃদ্ধি মিলিয়ে কালাই পৌরসভার গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ হলে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর এই মডেল আরও বিস্তৃত হবে।