উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই মেলা শুধু একটি অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় ব্যাপার নয়; বরং কালের পরিক্রমায় এটি হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জনজীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ শুক্রবারে তুলসীগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা সন্ন্যাসতলীতে এই মেলা বসে। মেলার দিন ভোর থেকে মানুষের ঢল নামে পুরো এলাকায়। আকাশজুড়ে উড়তে থাকে শত শত রঙিন ঘুড়ি, আর মেলার মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্ন্যাস ঠাকুরের স্মরণে শুরু হওয়া এই আয়োজন ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এখন সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মেলার দিনে জয়পুরহাট ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমান। কেউ আসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে, কেউ কেনাকাটা করতে, আবার কেউ আসেন কেবল ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে।
ক্ষেতলাল সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে তুলসীগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে সন্ন্যাসতলীর অবস্থান। এই মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘুড়ি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আকাশজুড়ে ছোট-বড়, বাহারি রং ও নকশার অসংখ্য ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি তরুণ ও বয়স্করাও ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দে মেতে ওঠেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিক্রেতারাও তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেন। রঙিন ঘুড়ির সমারোহে পুরো আকাশ যেন এক বিশাল উৎসবমঞ্চে পরিণত হয়।
তবে শুধু ঘুড়িই নয়, এই মেলা গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতিরও এক বড় প্রদর্শনী। মেলায় দা, বঁটি, ছুরি, কোদাল, কাঁচি, ডালি, চাঙারি, পলো, খলশানি, মাছ ধরার জালসহ কৃষি ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীর দোকান বসে। এ ছাড়া মিষ্টান্ন, খেলনা, পুতুলনাচ, প্রসাধনী, কসমেটিকস, পোশাক, মাটির তৈরি সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের পসরাও থাকে ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। শিশুদের বিনোদনের জন্য থাকে নাগরদোলা ও বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন।
মেলায় ঘুরতে আসা ৭০ বছর বয়সী রেফাজ উদ্দিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। তখন এত রাস্তাঘাট ছিল না। নদী পার হয়ে মেলায় আসতে হতো। এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মানুষের আগ্রহ এতটুকু কমেনি।’
মেলায় ঘুড়ি কিনতে আসা ১০ বছর বয়সী কিশোর জয় বলেন, ‘সারা বছর অপেক্ষা করি এই মেলার জন্য। এখানে এসে ঘুড়ি কিনে ওড়াতে খুব ভালো লাগে।’
জয়পুরহাটের ঘুড়ি বিক্রেতা মওলা আকন্দ জানান, ‘বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এই এক দিনেই সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি বিক্রি হয়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘুড়ি কিনে নিয়ে যায়।’
মেলার ইজারাদার রিপন মণ্ডল বলেন, ‘এক দিনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকায় আমি এই মেলা ইজারা নিয়েছি। সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মেলা চলছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তারুল আলম বলেন, মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরী বলেন, সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। মেলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে।