জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার তেলিহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা, পুকুরপাড় ও অন্যান্য সরকারি খাস সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে ইটের স্থাপনা নির্মাণ, রাস্তা সংকুচিত করা, পুরোনো গাছ কেটে নেওয়া এবং কবরস্থান ও পুরোনো উপাসনাস্থলের জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক লিখিত আবেদন করে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। ২০২৫ সালে দেওয়া ওই আবেদনের অনুলিপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
অভিযোগে তেলিহার গ্রামের মো. আশরাফ ফকির, সিরাজুল ইসলাম ফকির ও মো. ওসমান মোল্লার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের পক্ষ থেকে ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দেওয়া পৃথক আবেদনে সংশ্লিষ্ট জমিকে সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনে সংশ্লিষ্ট দাগ ও খতিয়ানের তথ্য তুলে ধরে জমির অংশবিশেষ পুকুরপাড়, উপাসনাস্থল ও জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে যাতায়াতের পথেও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা, স্থানীয় দরিদ্র মানুষ ও চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা দুর্ভোগে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট জমির বিবরণে সিএস খতিয়ান নম্বর ৮৭, এমআর খতিয়ান নম্বর ০১ এবং সংশ্লিষ্ট দাগ নম্বরের উল্লেখ রয়েছে। আবেদনে পুকুরপাড় ও উপাসনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত জমির পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলিহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি মো. ফজলুর রহমান মোল্লা বলেন, প্রায় ৪০টি ভূমিহীন পরিবার এখানে বসবাস করছে। ২০০০ সাল থেকে তাঁরা এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দখলের কারণে বর্তমানে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘একদিন হঠাৎ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব জায়গা নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে দখল শুরু করেন। আশ্রয়ণবাসীর প্রশস্ত রাস্তার ওপর ইটের স্থাপনা নির্মাণ করায় এখন রাস্তা বড়জোর সাড়ে চার ফুটের মতো রয়েছে। ফলে মানুষ চলাচল, পুকুরে মাছের খাবার নেওয়া কিংবা মাছ পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে।’
আশ্রয়ণের বাসিন্দা বন্যা বলেন, রাস্তা সংকুচিত হওয়ায় ছোট-বড় যানবাহন ঢুকতে চায় না। এতে পুকুরের মাছ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা মুঞ্জুয়ারার অভিযোগ, রাস্তার ওপর স্থাপনা নির্মাণের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের নারীরা বাধা দিলে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। একজন কোদাল দিয়ে তাঁকে আঘাত করার চেষ্টা করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা সহিদা বেগম বলেন, তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কবর ওই স্থানে রয়েছে। তাঁরা কবরগুলো ঘিরে গাছ লাগিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে কবরের চিহ্ন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার ভাসুর, ভাসুরের স্ত্রী এবং আমাদের দুই সন্তানের কবর এখানে রয়েছে। এখন কবরের চিহ্নগুলো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আমরা মারা গেলে কবর দেওয়ার জায়গা কোথায় হবে—এটাই আমাদের চিন্তা।’
স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দাও ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কবরস্থান থাকার কথা জানিয়েছেন। তেলিহার গ্রামের ৮৫ থেকে ৮৬ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন জানান, তাঁর স্মরণশক্তি হওয়ার পর থেকেই তিনি ওই জমিকে খাস জমি হিসেবে দেখে আসছেন। তাঁর দাবি, সেখানে কবরস্থান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার স্থানও ছিল।
একই গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী কফিল উদ্দিন মন্ডলও সরকারি খাস জমি ও কবরস্থান নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা লালচান রবিদাসের দাবি, ওই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পুরোনো উপাসনাস্থল রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সেখানে মানত ও পূজা করতে আসেন। বর্ষাকালে পূজা ও ভোগের সুবিধার জন্য স্থানীয়রা সেখানে টিনের ছাউনি তৈরি করেছিলেন। পরে ওই স্থাপনা ভেঙে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে আমরা স্থাপনা তৈরি করছি। এখানে কোন দখলদারির ব্যাপার নেই। তছাড়া এখানে কোন মন্দিরও নেই। একটি পুরোনো গাছ আছে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান সবাই মানত করে। কবরস্থানের কথা বলা হলেও সেখানে কয়েকটি কবর আছে, সেগুলো আমাদের স্বজনদের। অন্য কোনো গ্রামবাসীর কবর নেই।’
তিনি আরও দাবি করেন, যে পুরোনো গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেগুলো তাঁদের নিজেদের। সরকারি কোনো গাছ কাটা হয়নি। জমির মালিকানার পক্ষে তাঁদের কাগজপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযুক্ত মো. আশরাফ ফকির ও মো. ওসমান মোল্লাও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জমির রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। এরপর যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি রেকর্ড, দাগ-খতিয়ান ও সরেজমিন সীমানা যাচাই করে জমির প্রকৃত মালিকানা ও শ্রেণি নির্ধারণ করা হোক। সরকারি জমি দখলের প্রমাণ মিললে তা উদ্ধার এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পের চলাচলের রাস্তা, কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার পথ ও জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থান দখলমুক্ত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।