জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে চাঁদা না দেওয়ায় ‘মব’ সৃষ্টি করে এক ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার কৃষ্ণকোলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আজ রোববার আক্কেলপুর থানায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রধান আসামি রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আল আমিন ও আজাদের বাবা কাশেম আলী আজ দুপুরে আক্কেলপুর থানায় এজাহার দেন। মামলার এজাহারে নগদ সাত লাখ টাকা লুট এবং ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা দোকানের মালামাল ও বাড়ি থেকে নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় চারটি ট্রাক্টর, শ্যালো মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভাঙচুর করা হয়।
সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার বুড়াপুকুর-বিষ্ণপুর গ্রামের সাগর হোসেন কয়েক মাস আগে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি ইজিবাইক কিনেছিলেন। গত ৯ আগস্ট রাতে তাঁর বাড়ির তালা কেটে ইজিবাইকটি চুরি হয়। এ ঘটনায় তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও এখনো ইজিবাইকটি উদ্ধার হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাতে বুড়াপুকুর এলাকায় কয়েকজন লোক চারজনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। পরে ধাওয়া করে তিনজনকে আটক করা হয়, আর একজন পালিয়ে যান। চাঁরদীঘি গ্রামের রাজু সেখানে গিয়ে আটক তিনজনকে রাতে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরদিন শনিবার বুড়াপুকুর গ্রামের মসজিদের পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় প্রকাশ্যে সালিস বসে। সেখানে আটক তিন সন্দেহভাজনসহ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সালিসে আটক ব্যক্তিরা সাগর হোসেনের ইজিবাইক চুরির কথা স্বীকার করেন এবং ইজিবাইকটি কৃষ্ণকোলা গ্রামের একটি দোকানে বিক্রি করেছেন বলে জানান। সালিসের ভিডিও পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর রাজুর নেতৃত্বে আটক তিন ব্যক্তিকে কৃষ্ণকোলা গ্রামের ভাই-ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ও মেশিনারিজের দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বুড়াপুকুর-বিষ্ণপুর ও চাঁরদীঘি গ্রামের তিন শতাধিক মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে লোকজন উত্তেজিত হয়ে দোকান ও পাশের বাড়িতে হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক তিন সন্দেহভাজনকে থানায় নিয়ে যায়। গতকাল বিকেলে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ওই দিনই তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, প্রায় এক যুগ আগে তিনি ও তাঁর ভাই আজাদ গ্রামে ওয়ার্কশপের ব্যবসা শুরু করেন। তাঁরা সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রায় এক মাস আগে চাঁরদীঘি গ্রামের রাজু লোকজন নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চান। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাজু তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
আল আমিন বলেন, ‘গতকাল চোরাই ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার অভিযোগ তুলে আমাদের দোকান ও বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ভাঙচুরের পাশাপাশি বাড়ি থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা, স্বর্ণালংকার এবং দোকানের যন্ত্রাংশসহ প্রায় ১৪ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।’
চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজু। তাঁর দাবি, আটক তিন ব্যক্তি ইজিবাইক চুরির কথা স্বীকার করায় তাঁদের নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ওই দোকানে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি।
রাজুর অভিযোগ, আল আমিন ও তাঁর ভাই আজাদ দীর্ঘদিন ধরে চোরাই ইজিবাইক ও যন্ত্রাংশ কেনাবেচা করে আসছেন। তবে আল আমিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা কোনো চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচা করেন না; বৈধভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন রেজা বলেন, তিনি শনিবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, চোরাই ইজিবাইকের মালামাল ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগ তুলে একদল লোক ‘মব’ সৃষ্টি করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর করেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তিনি আরও বলেন, কাশেম আলী ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল হোতা ও মামলার প্রধান আসামি রাজুকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।