দোকানের ঝাঁপ খোলা। সামনে সাজানো চা, পান, বিস্কুট, কেকসহ নানান পণ্য। পাশে চুলার ওপরে চায়ের কেটলি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু। শুধু দোকানদার নেই। যাঁরা চা-পান বা পণ্য কিনতে আসেন, তাঁরাই বিক্রেতা। এভাবেই টানা চার বছর ধরে চলছে দোকানটি।
এই ব্যতিক্রমী দোকানটি গড়ে উঠেছে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে। দোকানে ক্রেতারা এসে নিজের হাতে চা বানিয়ে খেয়ে বা কেক-বিস্কুট নিয়ে দাম হিসাব করে দোকানের ক্যাশে রেখে যান। কেউ কেউ বাকি নিয়ে পরে এসে পরিশোধ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানে বৃদ্ধ হারুনুর রশিদ কয়েক কাপ চা তৈরি করছেন। আর দোকানের বেঞ্চে অনেকে বসে আছেন। দেখে মনে হলো, তিনিই দোকানি। কিন্তু পরে বোঝা গেল, তিনিও দোকানের একজন ক্রেতা। নিজের জন্য চা বানানোর পাশাপাশি অন্যদের জন্যও চা তৈরি করছেন তিনি। চা খাওয়া শেষে যে যাঁর মতো বিল পরিশোধ করে চলে যাচ্ছেন।
বৃদ্ধ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দোকানে বেশির ভাগ সময় বিক্রেতা থাকেন না। চা খেতে ইচ্ছা করলে এসে নিজেই বানিয়ে নিই। সঙ্গে কেউ থাকলে তার জন্যও বানিয়ে দিই। খাওয়া শেষে যত টাকা বিল হয়, দোকানে রেখে চলে যাই। এই দোকানে কেউ কাউকে পাহারা দেয় না। কিন্তু সবাই নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়।’
শুধু হারুনুর রশিদ না, দোকানে আসা প্রায় সব ক্রেতাই একই নিয়ম মেনে চলেন। আফাঙ্গীর হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, যাঁর যখন প্রয়োজন, তখন তিনিই দোকানদার। পণ্য নিয়ে বা চা খেয়ে দাম রেখে চলে যাচ্ছেন। টাকা না থাকলে পরে এসে পরিশোধ করছেন। চার বছর ধরে এভাবেই চলছে। পণ্য নিয়ে দাম না দেওয়ার ঘটনা সাধারণত ঘটে না। মানুষের সততার ওপরই দোকানটি চলছে।
এই সুন্দর ব্যবস্থার পেছনে যিনি রয়েছেন, তিনি পার্শ্ববর্তী ভালকি গ্রামের মৃত মুরাদ আলী মণ্ডলের ছেলে সমসের আলী। তিনিই এই দোকানের মালিক। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে চা, বিস্কুট, কেকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখেন। কেটলি বসিয়ে চুলা জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যান নিজের অন্য কাজে। সময় পেলে দুপুরে এসে দোকানের অবস্থা দেখে যান। রাতে এসে সারা দিনের বেচাকেনার হিসাবনিকাশ করে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন।
সমসের আলী জানান, একসময় তিনি চারাতলা বাজারেই বেশি সময় কাটাতেন। তখন অন্যের দোকানে বসে না থেকে নিজেই একটি দোকান করার চিন্তা করেন। কিন্তু অন্য ব্যবসার কারণে সব সময় দোকানে বসে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কর্মচারী রাখার সামর্থ্য বা ইচ্ছাও ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সমসের আলী বলেন, ‘সকালে এসে দোকান খুলে পণ্য সাজিয়ে রাখি। চুলা জ্বেলে দিয়ে চলে যাই। যার যখন প্রয়োজন হয়, নিজের মতো করে চা-পান বানিয়ে খান। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা লাভ হয়। মানুষের সততার ওপর ভরসা রেখেই দোকানটি চলছে। মানুষের ওপর এতটা ভরসা করেও কখনো ঠকতে হয়নি।’
সদর উপজেলার সাধুহাটি এলাকা থেকে চারাতলা বাজারে বেড়াতে আসা আব্দুল খালেক বলেন, ‘এমন ঘটনা খুবই বিরল। মানুষের প্রতি দোকানির বিশ্বাস আর মানুষের সততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মানুষ সৎ হলে জীবন কত সহজ আর সুন্দর হতে পারে, এখানে এসে সেটাই বুঝলাম। বিশ্বাসের জোরেই চার বছর ধরে ধোঁয়া উঠছে চায়ের কাপে, জমছে মানুষের আড্ডা আর নীরবে বেঁচে আছে সততার এক গল্প।’