তীব্র গরমে একপশলা বৃষ্টি যখন স্বস্তির পরশ হয়ে আসে, তখন সবার মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার নাপিতেরচর বলিদাপাড়া এলাকার বিধবা খুদেজা বেগমের কাছে সেই বৃষ্টিই যেন আতঙ্কের আরেক নাম। আকাশে মেঘ জমলেই তাঁর বুক কেঁপে ওঠে। কারণ, মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ, আছে শুধু পলিথিনের ছাউনি। বৃষ্টি নামলেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে পানি। বছরের পর বছর এমনই মানবেতর জীবন কাটছে তাঁর। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ যেন কবিতার পাতা ছেড়ে আজ বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে খুদেজা বেগমের জীবনে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ষাটোর্ধ্ব খুদেজা বেগমের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছোট্ট একটি টিনের ঘর। পুরোনো টিনের চাল ফুটো হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে তার ওপর দেওয়া হয়েছে পলিথিনের ছাউনি। তবে তাতেও বৃষ্টির পানি ঠেকানো যায় না।
ঘরটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে অল্প জায়গার মধ্যে গাদাগাদি করে রাখা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু। এক কোণে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দড়ি টানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কাপড়চোপড়। পাশেই বিছানো একটি চৌকি। মাথার ওপরের টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র। বৃষ্টি হলেই সেসব ছিদ্র দিয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ে। ভিজে যায় ঘরের মেঝে, বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও।
স্থানীয়রা জানান, সামান্য ঝোড়োবাতাসেই ঘরের পলিথিন উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে আতঙ্কে রাত কাটে খুদেজা বেগমের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। এ ছাড়া তাঁর আয়-রোজগারেরও কেউ নেই। সব মিলিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, খুদেজা বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। চার ছেলে ও তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলেদের কেউ ভ্যান চালিয়ে, কেউ দিনমজুরি খেটে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোনো মতে সংসার চালান। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চলে খুদেজা বেগমের। বয়সের ভারে সেই কাজের শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন।
খুদেজা বেগম বলেন, ‘বৃষ্টি আইলেই ঘর ভিজে যায়। তাই চালে পলিথিন লাগাইছি। আগে অন্যের বাড়িতে কাম করে সংসার চলত। এহন আর আগের মতো গতর চলে না। পুলারা ঢাহা শহরে কাম হরে খায়। অসুখে-বেসুখে কোনো মতে বেঁচে আছি। গরিব বলে কেউ দেহে না। বুড়ি বয়সে কোথায় যামু। খেয়ে না খেয়ে ঘরে পড়ে থাহি।’
প্রতিবেশী বজলুর রহমান পনিক মাস্টার বলেন, ‘খুদেজা বেগমের মতো অসচ্ছল পরিবার এলাকায় থাকলেও তাঁর মতো শোচনীয় অবস্থা কারও নেই। কারণ, তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় এখন আর আগের মতো অন্যের কাজ করতে পারেন না। এতে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও ঠিকভাবে পূরণ করা সম্ভব হয় না।’
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ্ মো. জুবায়ের বলেন, ‘এ উপজেলায় সবেমাত্র এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’