হোম > সারা দেশ > জামালপুর

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ‘কাচারি ঘর’

এম কে দোলন বিশ্বাস, ইসলামপুর (জামালপুর)

ইসলামপুরের গাইবান্ধা ইউনিয়নের নাপিতেরচর বলিদাপাড়া আকন্দ বাড়িতে কাচারি ঘর। গতকাল দুপুরে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় গ্রামবাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল ‘কাচারি ঘর’। বাড়ির সামনের আঙিনায় অতিথি, মুসাফির, পথচারী ও শিক্ষার্থীদের থাকার পাশাপাশি সালিস-বৈঠক, গল্প-আড্ডা কিংবা পড়াশোনার জন্য ব্যবহৃত হতো এ ঘর। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর এখন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে।

নব্বইয়ের দশকের আগেও গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে দেখা যেত কাচারি ঘর। কালের বিবর্তনে এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না গ্রামবাংলার একসময়ের এই আভিজাত্যের প্রতীক।

একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ইসলামপুর উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়িতে কাচারি ঘর ছিল। বাড়ির বাইরের আঙিনায় অতিথি, মুসাফির, ছাত্র ও জায়গিরদের থাকার জন্য নির্মিত এ ঘরকে কেউ বলতেন কাচারি ঘর, কেউ বাংলা ঘর। তবে স্থানীয়ভাবে এটি ‘খান্দা ঘর’ নামেও পরিচিত ছিল।

সাধারণত বাড়ির সামনের অংশে, প্রবেশপথের ঘাটলার কাছে কাচারি ঘর নির্মাণ করা হতো। বাড়ির সৌন্দর্যও অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত এ ঘর। অতিথি, পথচারী, মুসাফির ও সাক্ষাৎপ্রার্থীদের থাকার পাশাপাশি বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ঘর হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতো।

একসময় গ্রামবাংলার অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল কাচারি ঘর। চারচালা টিন বা শনের ছাউনি দিয়ে বাড়ির সামনে তৈরি করা হতো এ ঘর। সেখানে নিয়মিত থাকতেন আবাসিক গৃহশিক্ষক বা ‘লজিং মাস্টার’। সকালবেলায় এটি মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া সালিস-বৈঠক, গল্প-আড্ডা এবং পথচারী ও মুসাফিরদের বিশ্রামের স্থান হিসেবেও কাচারি ঘরের ব্যবহার ছিল।

কাচারি ঘরে অতিথি, পথচারী, মুসাফির ও বাড়ির ছেলেরা রাত যাপন করতেন। স্থানীয় অনেকের মতে, এর ফলে রাতের বেলায় বাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঘটনাও তুলনামূলক কম ঘটত।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঈসা খাঁর আমলে কর্মচারীরা বাড়ির দরজার পাশে থাকা কাচারি ঘরে বসে খাজনা আদায় করতেন। জমিদারি প্রথা চালু থাকার সময়ও গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির কাচারিতে বসে খাজনা আদায়ের প্রচলন ছিল। পাশাপাশি সালিস-বৈঠকসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো কাচারি ঘরে।

কালের বিবর্তনে সেই কাচারি ঘর এখন বিলুপ্তির পথে। কোনো কোনো বাড়িতে এখনো পুরোনো কাচারি ঘর দেখা গেলেও সেগুলো পড়ে আছে অযত্ন ও অবহেলায়। নেই সেই চিরচেনা শিক্ষার্থীদের পড়ার আওয়াজ, রাতের জারিগান, লুডু খেলা কিংবা অতিথিদের গল্প-আড্ডা। সকালবেলায় আর শোনা যায় না আরবি পড়ার মধুর সুর। দিনের বেলায় কাজের শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর করার বিশ্রামস্থল হিসেবেও এখন আর কাচারি ঘরের ব্যবহার নেই। কোথাও কোথাও একসময়কার বাড়ির সৌন্দর্যের প্রতীক এই ঘর অযত্ন-অবহেলায় পরিণত হয়েছে গোয়ালঘরে।

গাইবান্ধা ইউনিয়নের নাপিতেরচর বলিদাপাড়ার বাসিন্দা সুলতান আকন্দ বলেন, ‘আমার বাবা জীবিত থাকতে আমাদের বাড়ির বাইরে অবস্থিত কাচারি ঘরটি প্রতিবছর মেরামত করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর থেকে কাচারি ঘরটি আর তেমন মেরামত করা হয় না। কোনো কার্যক্রমও নেই। সময়ের পরিক্রমায় যে স্মৃতি হিসেবে কাচারি ঘরটি আছে, সেটিও কখন যে হারিয়ে যাবে, তা এখন দেখার বিষয়।’

বলিদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় গাইবান্ধা সুরুজ্জাহান উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক জয়নাল আবেদীন আকন্দ বলেন, ‘একসময়কার গ্রামবাংলার ঐতিহ্য কাচারি ঘর প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের আকন্দ বাড়িতে শুধু একটি কাচারি ঘর রয়েছে। কিন্তু কাচারি ঘর থাকলেও এখন কোনো কার্যক্রম নেই। ঘরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।’

ইট-পাথরের আধুনিক ভবনের ভিড়ে গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কোথাও ভগ্নদশায়, কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব ঘর এখন কেবলই অতীতের স্মৃতি বহন করছে। হয়তো আর কিছুদিন পর সেগুলোও হারিয়ে যাবে—থেকে যাবে শুধু গল্প, স্মৃতি আর লোকজ ঐতিহ্যের পাতায়।