গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে; কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ মিলছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ডিজেল সংকট। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জেনারেটরও বেশিক্ষণ চালছে না। ফলে শ্রমিকেরা তাঁদের উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ করতে পারছেন না। এতে একদিকে শ্রমিকদের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে কমছে কারখানার উৎপাদন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনসহ জেলাটিতে পাঁচটি উপজেলা রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চারটি অফিসের আওতায় গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পুরো জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৯৭৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে দৈনিক মিলছে ৬২২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ৩৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে প্রতিদিন জেলায় দিনে গড়ে ৮-৯ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরীর বেশ কয়েকটি কারখানা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা জানান, ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁরা নির্ধারিত কাজের লক্ষ্য পূরণ করতে পারছেন না।
কারখানার শ্রমিক রাকিব হাসান বলেন, ‘অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে আমরা টার্গেট পূরণ করতে পারছি না। সামনে ঈদ। টার্গেট পূরণ করতে না পারলে বেতন-বোনাস ঠিকমতো পাব না।’
হ্যামস্ গার্মেন্টস নামের কারখানার শ্রমিক রোকেয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে বিদ্যুতের সমস্যা। কষ্ট করে কাজ করে বাসায় ফিরে দেখি কারেন্ট নেই।’
ইয়ান নিট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদনও কমে গেছে।
হ্যামস্ গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার অফিসাররা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ডিজেল সংকটের কারণে কারখানা চালাতে পারছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিজেলের জন্য দাঁড়িয়ে থেকেও তা মিলছে না। চরমভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ সংকট দীর্ঘ হলে তৈরি পোশাকশিল্প মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।’
তাকওয়া ফ্যাশনের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মাহফুজুল রহমান বলেন, ‘আমাদের দুটি কারখানা গ্যাসের সাহায্যে পরিচালনা করার ফলে উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না। তবে পণ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা হচ্ছে। পরিবহনের জন্য ঠিকমতো জ্বালানি পাচ্ছে না গাড়িগুলো। যে কারণে সঠিকভাবে মালপত্র সরবরাহ করা যাচ্ছে না।’
শিল্পকারখানার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জেলাটির বাসিন্দারা। মহানগরীর দেশিপাড়ার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে পিক-আওয়ার কিংবা অফ পিক আওয়ার বলে কিছু নেই।’
জানা গেছে, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর চাহিদা ১৪০ মেগাওয়াট, বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯০ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতায় শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীন কালিয়াকৈর উপজেলায় চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে ১২০ মেগাওয়াট।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার আজাদ বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।’
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিল্পকারখানার উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষে সব সময় নজরদারি করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে।