বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও শফিকুর রহমানের বাসার সেই গৃহকর্মী শিশু এখন গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। দীর্ঘদিনের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাকে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বেডে কাতরাতে দেখা গেছে। ১১ বছর বয়সী ওই শিশুর শরীরজুড়ে মারধর ও পোড়া ক্ষতের চিহ্ন। চিকিৎসক বলছে তাকে সাইকোথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন।
এ ঘটনায় বিমানের এমডি শফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নির্যাতিত শিশুটি রাজধানীর উত্তরায় বিমানের এমডি শফিকুর রহমানের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে প্রায় আট মাস আগে থেকে কাজ করত। গত ৩১ জানুয়ারি গুরুতর অসুস্থ ও নির্যাতনের চিহ্নসহ তাকে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শিশুটির বাড়ি পঞ্চগড় জেলা। তার পরিবার বর্তমানে গাজীপুরে বসবাস করছে।
গতকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটির বুক, পিঠ, হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর ও পোড়া ক্ষতের দাগ রয়েছে। কোনো ক্ষত শুকিয়ে টান ধরেছে, আবার কিছু ক্ষত এখনো দগদগে। মারধরের পাশাপাশি শিশুটি রক্তস্বল্পতা ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
ভুক্তভোগী শিশু জানায়, তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং দিনের অধিকাংশ সময় বাথরুমে আটকে রাখা হতো। মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি।
শিশুটির বাবা জানান, অভাবের সংসারে সচ্ছলতার আশায় আট মাস আগে মেয়েকে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজে দেন। গৃহকর্ত্রী বীথি মেয়ের মতো লালন-পালনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তাঁর মেয়েকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি সকালে ফোন করে হঠাৎ মেয়েকে নিয়ে যেতে বলা হয়। রাতে বাসায় গিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে ক্ষতবিক্ষত মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং ঘটনা প্রকাশ না করতে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শেখ ফরহাদ বলেন, দীর্ঘদিনের শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি শিশুটি মারাত্মক মানসিক ট্রমার শিকার। তাকে নিয়মিত সাইকোথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন।
গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন মাহমুদ জানান, ৩১ জানুয়ারি রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। মানবিক বিবেচনায় পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
জিএমপি সদর মেট্রো থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, শিশুটিকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজি) মহিতুল ইসলাম হাসপাতালে এসে শিশুটিকে দেখে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী রফিক আহমেদ জানান, রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও শফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাতে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের নিজ বাসা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুজন হলেন ওই বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগম। তাঁদের সবাইকে শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।