হোম > সারা দেশ > গাইবান্ধা

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: তালা খোলা নিয়ে গাইবান্ধায় ফের উত্তেজনা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ঝুলিয়ে দেওয়া তালা খুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে তালা কে বা কারা খুলেছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। এ ঘটনায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দুই কার্যালয়ের প্রধান ফটকের তালা খোলা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাভাবিকভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউএনও কার্যালয়ের দুজন কর্মচারী বলেন, ‘সকালে অফিসে এসে দেখি তালা খোলা। কে বা কারা তালা খুলেছে, তা জানি না।’

এর আগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিয়োগের ফলাফল বাতিল এবং ইউএনও ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

দুপুর ১২টার দিকে পৌর শহরের বাহিরগোলা জামে মসজিদ মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মূল ফটকেও তালা দেওয়া হয়।

এতে উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে থাকা ইউএনও কার্যালয়, উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা তথ্যসেবা অফিস ও উপজেলা আইসিটি অফিসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বিক্ষোভকারীরা ‘অবৈধ নিয়োগ মানি না, মানবো না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিয়োগ বাতিল না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচিতে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে যথাযথ নিয়ম, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা অনুসরণ করা হয়নি। পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

তালা খুলল কে?

বুধবার সকাল থেকে দুই কার্যালয়ের প্রধান ফটকের তালা খোলা পাওয়া গেলেও রাতের আঁধারে তালা কে বা কারা খুলেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ নিয়ে বিএনপি ও প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা বিআরডিবির চেয়ারম্যান ইফতেখার হোসেন পপেল তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে অভিযোগ করেন, রাতের আঁধারে প্রশাসন তালা ভেঙে অফিসে প্রবেশ করেছে।

তিনি লেখেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড জরিপকারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রতিবাদে আমরা উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অফিসের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়ভাবে উপজেলা প্রশাসন রাতের আঁধারে সেই তালা ভেঙে আজ অফিসে প্রবেশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।

উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে উপজেলা প্রশাসন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদেই আন্দোলনকারীরা কার্যালয়ে তালা লাগিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে তালা খুলে দেওয়ার কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলা হয়নি। তাহলে কীভাবে তালা খুলল, তা আমাদের জানা নেই। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, ‘আমরা তালা লাগিয়েছি। এখনো বিষয়টির সমাধান হয়নি। তাহলে কে তাদের তালা খোলার অনুমতি দিয়েছে? বিষয়টি আমরা জানতে চাই।’

নিয়োগে অনিয়ম হয়নি: ইউএনও

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘যাঁরা সরকারি দপ্তরে তালা দেন, তাঁরা মূলত সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের কাজ করেছেন। সরকারি অফিস সরকারি নিয়ম অনুযায়ীই চলবে। স্বাভাবিকভাবেই অফিসের কার্যক্রম চলছে।’

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি। বরং যোগ্য প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। ছয়টি বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং বোর্ডগুলোই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তারা আমাকে জানাতে পারতেন। তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’

ফুলছড়িতেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

এদিকে একই কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গাইবান্ধার ফুলছড়িতেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগের পর বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেছে উপজেলা বিএনপি।

ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস ছালাম সরকার দাবি করেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, একটি চিহ্নিত কুচক্রী মহল প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রশাসনকে বিতর্কিত করতেই পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আব্দুস ছালাম সরকার আরও বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপি কিংবা দলের কোনো সহযোগী সংগঠনের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। বিএনপি সব সময় শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের দাবি তুলে ধরে।’

তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুস ছালাম সরকারের নেতৃত্বে দলীয় নেতা–কর্মীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে জেলার সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী ও গাইবান্ধা সদর উপজেলাতেও ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা।

ফলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় প্রশাসন ও বিএনপির মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।