গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়েছে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশ। ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে ভাঙন শুরুর আগে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।
আজ বুধবার সকাল থেকে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার ভোররাত থেকে ভাঙন শুরু হয় বিদ্যালয়টিতে। এতে বিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অবশিষ্ট অংশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিস্তার ভাঙনে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়টি ঝুঁকিতে ছিল। বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল সংশ্লিষ্টদের কাছে। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, পাউবোসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শনও করেছিলেন এলাকাটি। সর্বশেষ ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। কয়েক দিনের ব্যবধানেই বিদ্যালয়ের একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভাঙনের ঝুঁকির সময় জিও ব্যাগ ফেলা হলে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যেত। তাঁদের দাবি, অবশিষ্ট অংশ রক্ষার পাশাপাশি দ্রুত নিরাপদ স্থানে বিদ্যালয়টি পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে তিস্তার ভাঙনপ্রবণ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতি রক্ষায় আগাম ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয়টির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মেহেদী হাসানের অভিভাবক মো. মোজাম্মেল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন হামার স্কুলই নাই আর ওমরা (তারা) আইসছে ব্যাগ নিয়া। এ্যালা (এগুলো) নিয়া কী করি হামরা (আমরা)। ওমাক (উনাদের) কন ওমরা (তারা) ওমার (তাদের) ব্যাগ নিয়া যাউক।’
প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘আজকে ট্রলারে ট্রলারে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তাঁরা যদি আর দুই দিন আগে ফেলতেন, তাহলে এত বড় বিপদ দেখতে হতো না আমাদের। অথচ বহুদিন বহু জায়গায় অভিযোগ দিয়েছিলাম। কেউ গুরুত্ব দেননি এত দিন। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর উনারা এসেছেন।’
খুব দ্রুত নিরাপদ স্থানে বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়া হবে জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘ভাঙন শুরু হওয়ায় স্কুলের সবকিছু খুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম। তাঁরা সে কাজটিও করেছেন। এর আগেও ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছিলাম।’
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পরপরই জিও ব্যাগ ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কাজ চলছে। স্কুলটি রক্ষা করতে যা লাগে, তা ফেলা হবে।
বিদ্যালয়টি বিলীন হওয়ার আগে কেন জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি—জানতে চাইলে শরিফুল ইসলাম বলেন, ইতিপূর্বে ওই এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। গত সোমবারও সেখানে ভাঙন ছিল না। ভাঙন না থাকলে জিও ব্যাগ ফেলার অনুমতি নেই।
জিও ব্যাগ ফেলার সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমানের প্রতিনিধি ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শহিদুল ইসলাম সরকার মঞ্জু, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. সামিউল ইসলাম, ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুর রহমান মণ্ডল, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শহিদুল ইসলাম সরকার মঞ্জু বলেন, ‘নেতৃবৃন্দসহ ঘণ্টাতিনেক ছিলাম। আপাতত অস্থায়ী সমাধানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা হয়েছে।’
এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আরও আগে জিও ব্যাগ ফেলা হলে হয়তো স্কুলটির এত বড় ক্ষতি হতো না। স্থায়ী সমাধানে আমি কাজ করছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত যোগাযোগও রাখছি।’