জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আজ সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনে অবস্থিত পাঁচটি দোকান দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নজরুল হলের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ওই দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছিল। প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে কোনো সুরাহা করতে না পারায় আজ দুপুরে নজরুল হলের শিক্ষার্থীরা ওই দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর জেরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান নিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং তা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
মেডিকেলের তথ্যমতে, সংঘর্ষের ঘটনায় দুই হলের অন্তত নয়জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের আলী আরাফাত, আদনান আল মাহদী, এস এম শিমন হোসেন, মো. আরাফাত, মো. রোবিদ, রুহান এবং নজরুল হলের রেদোয়ান, কাজী রোকনুজ্জামান ও শিহাব উদ্দিন স্বাধীন রয়েছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাফিউল কাদের বলেন, ‘আজকের ঘটনায় প্রায় নয়জন আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় এবং একজন স্বেচ্ছায় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
তবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থী ও প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, এই সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁদের হলের অন্তত ২৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলার শিকার নজরুল হলের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন স্বাধীন জানান, দুপুরে তাঁরা হলের ক্যান্টিনে খাওয়ার সময় ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী তাঁদের হলের সামনে গিয়ে গালিগালাজ ও উসকানিমূলক কথাবার্তা বলতে থাকে। তাঁরা হুমকি দেয় যে, পারলে দোকান দখল করতে, তা না হলে উড়িয়ে দেওয়া হবে। পরে তাঁরা বের হয়ে গেলে বিশ্বকবি হলের ১৫-২০ জন মিলে তাঁকে মারধর করেন এবং মাথা ফাটিয়ে দেন।
এ বিষয়ে কাজী নজরুল হল সংসদের ভিপি মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এটি দীর্ঘ ৯ মাসের ইস্যু। প্রশাসনকে ১ সেপ্টেম্বর আলটিমেটাম দেওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের গাফিলতির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলনে নামে, তখন ছাত্র সংসদ তাঁদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে বাধ্য হয়।’
অন্যদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংসদের জিএস মাহমুদুল হাসান ইমনের দাবি, নজরুল হলের দুই-আড়াই শ শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘দোকানগুলো নজরুল হল তৈরি হওয়ার আগে থেকেই সেখানে রয়েছে। তাঁদের হলের শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হওয়ায় নজরুল হলের শিক্ষার্থীরা তাঁদের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছেন এবং তাতে হলের ৫ জন শিক্ষার্থী মাথা ও চোখে আঘাত পেয়েছেন।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘দোকানগুলো একেবারে তাঁদের হলের সামনে। দোকানগুলো তাঁদের হলের অধীনে নেওয়ার জন্য তিনবার আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নজরুল হলের কয়েক শ ছাত্র লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে দোকানে ভাঙচুর চালায়। তাঁদের ছাত্ররা প্রতিহত করতে গেলে তাঁরা ইটের টুকরা ছোঁড়ে, তাতে তাঁদের ওয়ার্ডেনও আহত হয়েছেন।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকেই দুই হলের প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা দফায় দফায় আলোচনা করেছি। কিন্তু কবি নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। খবর পেয়ে প্রক্টরসহ প্রশাসনের পুরো দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। বর্তমানে দুই পক্ষ নিজ নিজ হলে অবস্থান করছে। দুই হলের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চলছে।’