হোম > সারা দেশ > ঢাকা

৮ বছর পর মোটরসাইকেলচালক হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন, গ্রেপ্তার তিন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

জামালপুরের ইসলামপুরে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিতে চালককে হত্যার ঘটনায় প্রায় আট বছর পর তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আজ রোববার (৩০ আগস্ট) সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. জালাল মিয়া (৪২), মো. নুর ইসলাম (৩২) ও মো. মোজাম্মেল হক (৪৮)। তাঁদের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার আগুনের চর এলাকায়।

২০১৮ সালের ২ জুলাই দুপুরের খাওয়া সেরে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন ভুক্তভোগী ওই চালক। মোটরসাইকেল নিয়ে বকশীগঞ্জ বাজারের উদ্দেশে রওনা করেন তিনি। রাতে বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

পরে ইসলামপুর থানার চুংরাপাড়া এলাকার পুবেরবন্দে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পান পরিবারের সদস্যরা। ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর স্ত্রী মরদেহটি স্বামীর বলে শনাক্ত করেন।

সিআইডির তদন্তে জানা যায়, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পূর্বপরিকল্পিতভাবে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চালককে কৌশলে পুবেরবন্দ এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই ইসলামপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। প্রথমে ইসলামপুর থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন হওয়ায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট মামলার তদন্তভার নেয় সিআইডি।

সিআইডি তদন্তভার নেওয়ার পর মামলার বিভিন্ন দিক নতুন করে পর্যালোচনা করে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় আসামিদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।

সিআইডি জানায়, তদন্তের একপর্যায়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নিহতের মোটরসাইকেলে থাকা তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি সংগ্রহ করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ওই ছবি দেখে তাঁদের শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এরপরও সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় সিআইডি।

জামালপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাট-বাজার ও জনসমাগমস্থলে ওই তিনজনের ছবি দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে তাঁদের ছবি প্রচার করা হয়। তাঁদের সম্পর্কে তথ্যদাতার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।

সিআইডির দাবি, এ প্রচারণার ফলে বিভিন্ন সূত্র থেকে সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে তাঁদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয় সিআইডি।

এরপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে সিআইডি জামালপুর ইউনিটের একাধিক দল। গত ২৬ আগস্ট জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার নাপিতের চর এলাকা থেকে জালাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি জানায়, জালালকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে অপর দুই আসামি নুর ইসলাম ও মোজাম্মেল হকের সম্পৃক্ততার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন তিনি। পরে জালালকে পুলিশ রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে সোপর্দ করা হয়।

জালালের দেওয়া তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে অপর দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৭ আগস্ট গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা থেকে নুর ইসলাম এবং গাজীপুর কলেজ রোড এলাকা থেকে মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি আরও জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে নুর ইসলাম ও মোজাম্মেল হকও হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তাঁরা আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। পরে তাঁরা আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির ভাষ্য, প্রায় আট বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা মামলাটির রহস্য উদ্‌ঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক তদন্ত ও একাধিক অভিযানের পর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।