হোম > সারা দেশ > ঢাকা

ব্যাটারিচালিত যান বন্ধ নয়, নীতিমালার আওতায় আনার তাগিদ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সম্মেলন কক্ষে বুধবার অনুষ্ঠিত ‘ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান এবং টেকসই গণপরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনার। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান হঠাৎ বন্ধ না করে নির্দিষ্ট এলাকা ও সড়কে চলাচলের সুযোগ রেখে নীতিমালার আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পনাবিদেরা। তাঁদের মতে, এসব যান বন্ধের আগে বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক, মালিক, আমদানিকারক, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ও চার্জিং স্টেশনগুলোকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

আজ বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সম্মেলন কক্ষে ‘ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান এবং টেকসই গণপরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। বিআইপি ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান ও পরিকল্পনাবিদ তাহসিন রেজা। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে প্রচলিত রিকশার সঙ্গে এক করে না দেখে মোটরচালিত পৃথক যান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব যান স্বল্প দূরত্বে দ্রুত ও তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের সুযোগ দিলেও গতি ও চলাচলের ধরন সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক অধ্যাপক এস এম সোহেল মাহমুদ বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নিয়ে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। এসব যানবাহনের নেতিবাচক প্রভাবের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য গবেষণা দরকার। মালিক, চালক, মেকানিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাই যন্ত্রাংশ আমদানি, কারখানা ও চার্জিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিকল্প পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।

বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদ আহ্বায়ক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় এনে যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানকে সমানভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। নির্দিষ্ট জোনে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান পরিচালনার পাশাপাশি লেগুনা, মিনিবাস ও টেম্পোর মতো পারাট্রানজিটের জন্যও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন, সরবরাহ ও চার্জিং নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে এসব যান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, ঢাকার মাস্টারপ্ল্যানের অন্যতম লক্ষ্য গণপরিবহনের অংশীদারত্ব বাড়ানো। সরকার বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী যাত্রীবান্ধব ও বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং মেট্রো স্টেশনকেন্দ্রিক সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, ঢাকায় প্রায় ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন কঠিন হচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে বাস পরিবহনেও প্রয়োজনীয় সরকারি ভর্তুকি নিশ্চিত করা দরকার।

বিআইপির সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ও যাতায়াতের সঙ্গে এসব যান যুক্ত। তাই ফার্স্ট মাইল ও লাস্ট মাইল সংযোগে এর ব্যবহার বিবেচনা করে নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করা যেতে পারে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেল মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নীতিমালা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব যানবাহনের চলাচলের নির্দিষ্ট পথ, কর প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয় নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, যানজট নিরসনে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। আন্তজেলা বাস ঢাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন বাস, লেভেল ক্রসিং, কমিউটার ট্রেন, নৌপথ, মেট্রোরেল ও মনোরেল নিয়ে কাজ চলছে। ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ে নীতিমালা করার আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, নগরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন সমস্যার সমাধানে শক্তিশালী গণপরিবহনের বিকল্প নেই। হাঁটা, সাইক্লিং ও গণপরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে বাস্তবতার আলোকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।